দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম এবং শতাধিক মাদ্রাসার মুহতামিমসহ মোট ৬০০ জন বিশিষ্ট আলেম সমকামী সহিংসতা প্রতিরোধে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে কার্যকর করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের পাঠানো এক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৩৯
বিবৃতিতে বলা হয়, সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের ঘটনায় তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত। দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন অপরাধ কেবল নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ই নির্দেশ করে না, বরং শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে। ইসলামে সব ধরনের অনৈতিক যৌন সম্পর্ক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণ, যৌন নিপীড়ন এবং বিশেষভাবে সমকামিতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কোমলমতি শিশুদের ওপর সমকামী সহিংসতায় লিপ্ত ছাত্র ও শিক্ষকের ইসলামি আদর্শ ও মাদ্রাসার পবিত্র পরিবেশের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সমকামী ও উভকামীদের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সমাজে এই সমকামী প্রবণতা প্রতিরোধ করা না গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিগত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা ফান্ডে বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক সমকামী আচরণকে স্বাভাবিকীকরণের কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে এনজিওগুলোর সহযোগিতা ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সমকামী নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি লাভ করেছে, অন্যদিকে সমকামিতা প্রতিরোধমূলক দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। এর ফলে সমকামিতার ব্যাধি ধীরে ধীরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। মাদরাসা সমাজের বাইরে কোনো ভিন্ন গ্রহের ভূখণ্ড নয়; সমাজে যখন কোনো অবক্ষয়ের বন্যা বইতে থাকে, মাদরাসাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
বিবৃতিতে বলা হয়, তারা চান মানুষের আস্থার জায়গা মাদরাসাগুলোতে একটিও অনাচার যেন না ঘটে। তারা বিশ্বাস করেন, কুরআন-সুন্নাহর আইনের সঠিক প্রয়োগেই এই সমস্যার সমাধান নিহিত। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততদিন বিদ্যমান আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে হলেও এই সামাজিক অবক্ষয়কে প্রতিরোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডে ১৫৩৩ সালে রাজা অষ্টম হেনরির আমলে সমকামী আচরণ ও পশুকামিতার বিরুদ্ধে ‘Buggery Act 1533’ পাস করা হয়েছিল। সেই আইনের মূল ধারণাকে ভিত্তি করেই ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশগুলোতে ৩৭৭ ধারার সংস্করণ তৈরি করে এবং তাদের অধীনস্থ প্রায় ৫০টিরও বেশি ঔপনিবেশিক অঞ্চলে একই ধরনের প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ সংক্রান্ত আইন জারি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাতেও প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং অস্বাভাবিক যৌন অপরাধের বিচার ও শাস্তির স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু এই ধারার কার্যকর প্রয়োগ না হওয়ায় অনৈতিকতার বিস্তার ঘটে চলেছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ ৯২% মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ এবং ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামিতা একটি নিকৃষ্টতম পাপাচার। তারা চান সমকামিতার মতো পাপাচার বা সমকামী সহিংসতা স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ভার্সিটি, মেস—যেখানেই ঘটুক না কেন, অপরাধীদের ৩৭৭ ধারার আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে সমকামিতার প্রচার-প্রসারের সাথে জড়িত প্রতিটি এনজিওর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
বিবৃতিতে বিশেষভাবে দাবি জানানো হয়, সাভারের এই নজিরবিহীন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে ৩৭৭ ধারাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় এনে যথাযথ ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের জঘন্য কাজ করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
বিবৃতি প্রদানকারীদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা মূল্যবোধ ডট কম (mullobodh.com) সাইটে প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতি প্রদানকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, ড্যাফোডিল ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর মোখতার আহমাদ, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাসজিদুত তাকওয়া ধানমন্ডির খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, সাইন্সল্যাব বায়তুল মামুর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা হাসান জামিল, মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স পল্লবীর খতিব আব্দুল হাই মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ।
আরও রয়েছেন লেখক ও গবেষক শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমীর মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মাসউদুল করীম, বাইতুশ শাকুর জামে মাসজিদ মিরপুরের খতিব ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ, মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামীর মুহতামিম ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান, মহানগর প্রজেক্ট জামে মসজিদের খতিব মাওলানা তাহমীদুল মাওলা, ফজর ইনস্টিটিউট ঢাকার মুহতামিম রুহুল আমীন সাদী, জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ির শিক্ষক মুফতি রেজাউল কারীম আবরার, রুপায়ন সিটি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ শামছুদ্দোহা আশরাফী, মাদরাসাতু বানাতিল ইসলাম ঢাকার খতীব আবদুল্লাহ আল ফারুক, দ্বীনিয়াত বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুফতি সালমান আহমদ, মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত মুহাম্মদপুরের মুহতামিম মুফতি সাঈদ আহমাদ, সুনিবিড় হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ মুহাম্মাদপুরের খতিব মুফতি আরিফ জাব্বার কাসেমী, তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকার মুহতামিম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, সরকারি তিতুমীর কলেজ জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইরফান জিয়া, মসজিদ-ই বাক্কাতিল মোবারকাহ কলাবাগানের খতিব মুফতি আবু মুহাম্মাদ রাহমানীসহ অন্যান্য বিশিষ্ট আলেমগণ।

















