সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিরোধ সৃষ্টি হলে তা বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকে পুনরায় উজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। তিনি সবাইকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভিন্নমত যেন শত্রুতার রূপ না নেয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ বা বিরোধ শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তাদের পথকেই সুগম করতে পারে।’
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাক-স্বাধীনতার সীমা যেন শালীনতার সীমা না ছাড়ায়, সেদিকেও খেয়াল রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দেশে এখন বাকস্বাধীনতা অবারিত হলেও তা যেন কোনোভাবেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে রাজনীতি থেকে গালাগালির সংস্কৃতি পরিহার করারও তাগিদ দেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় সোর্স বা বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি। দেশকে সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর করে ফেলা হয়েছিল। আমরা দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় গ্যাস আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে আমাদের দু’টি এফএসআরইউ’র (এলএনজি টার্মিনাল) একটি দুর্ঘটনার কারণে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। এটি বাড়তি বিপদের সৃষ্টি করেছে।’
বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই সংকট সমাধানে বিরোধী দলের বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম লংমার্চের আয়োজন করা হয়েছে। লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমাধান করা যেত, তাহলে আমরাই সবার আগে লংমার্চ করতাম। জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কিনা, সে প্রশ্নও উঠছে।’
প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা উত্তরাধিকার সূত্রেই এই সংকট পেয়েছি। তবে আমরা বসে নেই, ইতিমধ্যেই অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমরা শুধু বিদ্যুৎ গ্রাহক নয়, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হওয়ার পরিকল্পনায় এগোচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আমরা এই গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ্।’
তিনি আরও বলেন, যখনই দেশের মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রতিবারই দেশকে সংকট থেকে বের করে এনেছে। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সংকটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি হাল ধরেছে এবং সফল হয়েছে। জিয়াউর রহমান তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে দেশকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিলেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এবং দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও বিএনপি দেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল।’
ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারা (ফ্যাসিবাদ) শুধু লুটপাট ও অর্থ পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, খেলাপি ঋণের হিসাবেও জালিয়াতি করেছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অথচ আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। তবে আমাদের সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে গত ৫ মাসে তা কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।’
রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা দেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছেন, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কিন্তু এই দেশের কাঁধে যে ঋণের বোঝা, তা আমাদেরই শোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার গত ৫ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।’
সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব শব্দ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপ্রতিনিধি হয়েও কেন আমরা সেই শব্দগুলো জনপরিসরে ব্যবহার করবো? কেন আমরা সেগুলো পরিহার করবো না? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত না হয়। আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি রুচিশীল সমাজ গঠন করি।’
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে সংসদ নেতা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ১৪০০ মানুষ জীবন দিয়েছেন, ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। তাই আসুন, সরকারি বা বিরোধী দল—সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’

















