অর্থনীতি

বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রভাব

প্রতিবেদক
সব খবর

সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি তেল নিয়ে আসা এমটি নিনেমিয়া নামের একটি ট্যাংকার বাব আল-মানদেব প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে প্রায় ৫০ দিনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। স্বাভাবিকভাবে এই পথে ১৬ দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব ছিল এবং এতে খরচও অনেক কম হতো। ট্যাংকারের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রাইম ওশেন ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পি কে রয় জানিয়েছেন, ঘুর পথে একটি ট্যাংকারে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আনার গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি। কিন্তু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা মোখা বন্দর ও বাব আল-মানদেবের কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করার পর এই পথেও ঝুঁকি বেড়েছে। যদিও হুতিরা এখন পর্যন্ত সব আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করেনি এবং তাদের দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ, তবুও নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় জাহাজমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকি কেবল জ্বালানি আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের রপ্তানির একটি বড় অংশ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের একাংশে যায় বাব আল-মানদেব, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে। এছাড়া মিসর, মরক্কোসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যেও এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৫১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং এসব দেশ ও অঞ্চল থেকে ১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সব মিলিয়ে এই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি বা ৪৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এসব বাজারে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশ যায়, অন্যদিকে এসব অঞ্চল থেকে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আসে। তবে পুরো বাণিজ্য এখনই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হলে অথবা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজ কোম্পানিগুলো বাব আল-মানদেব এড়িয়ে চলতে শুরু করলে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।

হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। হরমুজ দিয়ে বর্তমানে কার্যত বাংলাদেশে কোনো জাহাজ আসছে না এবং বাব আল-মানদেব দিয়ে আসা জাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিমা ব্যয়, জাহাজভাড়া, দীর্ঘ ট্রানজিট সময় এবং সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি পর্যন্ত অনেক খাতেই প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর ও যুক্তরাষ্ট্রের একাংশে পণ্যবাহী জাহাজ বাব আল-মানদেব ও সুয়েজ এড়িয়ে গেলে উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরতে হবে। শিপিং এজেন্টদের হিসাব অনুযায়ী, এতে যাত্রায় সাধারণত আরও ১০ থেকে ১২ দিন বাড়তি সময় লাগতে পারে, যা জাহাজের জ্বালানি ব্যবহার ও পরিবহন ব্যয় বাড়াবে। রপ্তানি পণ্যের সমুদ্রপথের ভাড়া সাধারণত বিদেশি ক্রেতারা বহন করলেও হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ব্যয় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা হতে পারে।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, রপ্তানিতে পরোক্ষ প্রভাবটাই বেশি হবে। বিদেশি ক্রেতারা পণ্য পরিবহনের বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করলেও দিন শেষে চাপটা আমাদের ওপর পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, তুরস্ক থেকে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তুলা আমদানিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে। কাঁচামাল আসতে সময় বেশি লাগলে উৎপাদন ও রপ্তানির সময়সূচিও চাপে পড়বে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাব আল-মানদেব সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, বিশেষ করে যেসব প্রতিযোগী দেশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। কারণ, পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ—দুটোই বাড়বে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতেও বাড়তি চাপ তৈরি হবে, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানির বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে সরকারকে এখনই জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে এবং মধ্য মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, গত মার্চ ও এপ্রিলে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের ব্যাপক সংকট হয়েছিল এবং বর্তমানে বাংলাদেশ যথেষ্ট গ্যাস পাচ্ছে না, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না এবং সারা দেশে দিনে কয়েক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ পড়েছে এবং দেশেও দাম বাড়াতে হয়েছে।

সব খবর