দেশের সাধারণ বীমা খাতে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বা বকেয়া দাবির পাহাড় জমেছে। ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে গ্রাহকদের মোট ৩,৪৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বা ২,৭৪৬ কোটি টাকাই আটকে আছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানির পেটে। বীমা খাতের এই নাজুক পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বীমা দাবি পরিশোধ করতে হবে এবং প্রয়োজনে গ্রাহকের পাওনা মেটাতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করতে হবে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে কোম্পানিগুলোর পাঠানো চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। জুন শেষে ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে মোট ৩,৪৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। এর বিপরীতে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে কোম্পানিগুলো নিষ্পত্তি করেছে ৫১৯ কোটি ৩২ লাখ টাকার দাবি, যা মোট দাবির মাত্র ১৩.০৯ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে এসবিসিতে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির মোট দাবি ছিল ২,২৮০ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যার মধ্যে ২১৩ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিষ্পত্তি হয়েছে। জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ২,০৬৭ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যেখানে নিষ্পত্তির হার মাত্র ৯.৩৮ শতাংশ।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিষ্পন্ন দাবি গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট দাবি ছিল ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যার মধ্যে ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনিষ্পন্ন রয়েছে ২৯৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এছাড়া প্রগতি ইনস্যুরেন্সে ১৫৬ কোটি ৮৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা, রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্সে ১৪০ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং পিপলস ইনস্যুরেন্সে ৮৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এই চার বেসরকারি কোম্পানিতে মোট অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৬০৩ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার টাকা।
আইডিআরএর তথ্যমতে, অধিকাংশ কোম্পানিরই দাবি নিষ্পত্তির হার ৫০ শতাংশের নিচে, এমনকি কয়েকটি কোম্পানিতে তা ১০ শতাংশেরও কম। এর মধ্যে নর্দার্ন ইসলামী ইনস্যুরেন্স দাবি নিষ্পত্তির হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, যেখানে নিষ্পত্তির হার মাত্র ০.৯৩ শতাংশ। এছাড়া অগ্রণী ইনস্যুরেন্সের নিষ্পত্তির হার ১.৫২ শতাংশ, পিপলস ইনস্যুরেন্সের ২.৬৪ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ইনস্যুরেন্সের ২.৪৮ শতাংশ, মেঘনা ইনস্যুরেন্সের ৫.৪৬ শতাংশ, ইসলামী ইনস্যুরেন্স বাংলাদেশের ৬.২৮ শতাংশ এবং দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্সের ৬.৩১ শতাংশ।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানান, বছরের পর বছর জমে থাকা আস্থার সংকট, তথ্য গোপনের অপচেষ্টা আর দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া দাবির বেড়াজালে বীমা খাত স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। গ্যারেজে বা আড়ালে সার্ভার লুকিয়ে রেখে কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে আর কোনো প্রতিষ্ঠান পার পাবে না এবং বকেয়া দাবি পরিশোধই আমাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ৪৪আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫: ৪৫

















