যখন প্রথম বোর্হেসকে পড়ি, তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যে ততটা পরিচিত নাম ছিলেন না। তাঁর নাম ছিল তরুণ লেখক ও পাঠকের মধ্যে এক গোপন সংকেতের মতো। মেক্সিকোতে ১৯৪০ সালের কাছাকাছি সময়ে, হোসে লুইস মার্তিনেস, আলি চুমাসেরো, হাভিয়ের ভিয়াউরুতিয়া এবং আরও কয়েকজন তরুণ লেখক তাঁকে এক বিশেষ নিষ্ঠা নিয়ে পড়তেন। বোর্হেস ছিলেন লেখকদের জন্য একজন লেখক।
তাঁর গল্প প্রথমে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হতো। ‘সুর’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশিত গল্পগুলো ১৯৪১ সালে ‘দ্য গার্ডেন অব ফর্কিং পাথস’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। লেখকের কাছে সেই পুরোনো সংস্করণটি আজও আছে, যার নীল মলাটে সাদা অক্ষরে একটি তীর দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করছে—এটি কোনো ভৌগোলিক দক্ষিণ নয়, বরং এক মানসিক ভূখণ্ডের দিকে ইঙ্গিত।
সেই সময় থেকে লেখক বোর্হেসকে পড়ে চলেছেন। তাঁর পাঠ কেবল একটি বই পড়া নয়, বরং একটি কণ্ঠের সঙ্গে নীরব কথোপকথন। পরবর্তী জীবনে খ্যাতি তাঁকে এক পৌরাণিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করলেও, প্রথম দিকের বোর্হেস ছিলেন অন্যরকম। তাঁর বইয়ের আড়ালে মানুষটি প্রায় অদৃশ্য ছিলেন, যেন তিনি নিজেই তাঁর কোনো গল্পের চরিত্র—এক লেখক, যিনি নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি বই রেখে গেছেন।
আলফোনসো রেয়েসের কাছে প্রথম তাঁর বাস্তব উপস্থিতির কথা শুনেছিলেন লেখক। রেয়েস তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন, স্নেহও করতেন, কিন্তু তাঁদের সাহিত্যিক রুচি ছিল ভিন্ন। বোর্হেসের কাছে রেয়েস ছিলেন গদ্যের গুরু, আর রেয়েসের কাছে বোর্হেস ছিলেন এক কৌতূহলোদ্দীপক ব্যতিক্রম। পেশাগত সহকর্মীদের মধ্যে যেমন ভুল বোঝাবুঝি জন্ম নেয়, তাঁদের সম্পর্কেও তেমনটাই ঘটেছিল।
১৯৪৭ সালে প্যারিসে, আর্জেন্টাইন বন্ধু হোসে বিয়াঙ্কো, সিলভিনা ওকাম্পো ও আদলফো বিয়োই কাসারেসের মুখে বোর্হেসের কথা এত শুনেছিলেন যে তাঁকে না দেখেই মনে হতো, তিনি তাঁকে চেনেন। এটিও এক ধরনের কল্পিত বন্ধুত্ব ছিল। লেখক তাঁর বন্ধু ছিলেন, কিন্তু বোর্হেসের কাছে লেখকের নাম ছিল তাঁর পরিচিত একজন মানুষের অস্পষ্ট স্মৃতি মাত্র।
অবশেষে ১৯৭১ সালে অস্টিনে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। সেখানে সৌজন্যের পাশাপাশি এক ধরনের দূরত্বও ছিল। বোর্হেস লেখকের সম্পর্কে কী ভাববেন বুঝতে পারছিলেন না; লেখকও তাঁর একটি কবিতার কারণে তাঁকে পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারেননি। ‘আলামোর রক্ষকদের’ প্রতি তাঁর প্রশংসা লেখককে আহত করেছিল, কারণ তাঁর দেশপ্রেম তখন ইতিহাসকে সরলভাবে দেখেছিল। বোর্হেসের বীরত্ববোধও কখনো কখনো ইতিহাসের জটিলতার চেয়ে কিংবদন্তিকে বেশি গুরুত্ব দিত। একজন ছুরি হাতে রাস্তার গুন্ডা এবং একজন মহাকাব্যের বীর—দুজনেই কিংবদন্তির অংশ হতে পারে, কিন্তু কিংবদন্তি তাদের নৈতিকভাবে সমতুল্য করে না।
পরবর্তীতে তাঁদের দেখা হয়েছে মেক্সিকো ও বুয়েনস আয়ার্সে। তখন কথাবার্তা সহজ হয়েছে এবং তাঁরা আবিষ্কার করেছেন যে তাঁদের প্রিয় অনেক কবি একই। বোর্হেস এই মিলগুলোতে আনন্দ পেতেন। কোনো কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি হঠাৎ আবৃত্তি করতেন, আর কথোপকথন বদলে যেত। সাহিত্য তখন আর আলোচনার বিষয় থাকত না, তা হয়ে উঠত এক ধরনের ভাগ করা অভিজ্ঞতা।
একবার মেক্সিকোর একটি অনুষ্ঠানে কিছু অতিরিক্ত উৎসাহী ভক্তের হাত থেকে বোর্হেসকে সরিয়ে নিয়ে লেখক ও তাঁর স্ত্রী এক কোণে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই তিনি তুলে-র কবিতা আবৃত্তি করেন। তাঁর কণ্ঠে যেন অন্য এক সময় উপস্থিত হয়েছিল। বোর্হেসের সঙ্গে থাকার এই ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা—বর্তমান সময়ের মাঝখানে হঠাৎ অতীত এসে দাঁড়াত।
বুয়েনস আয়ার্সে তাঁরা হাঁটতেন। একদিন মারিয়া কোদামা তাঁদের নিয়ে গেলেন পুরোনো লেজামা পার্কে। বোর্হেস একটি অর্থোডক্স গির্জা দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি বন্ধ ছিল। তাঁরা গাছের নিচে হাঁটতে লাগলেন। ভেজা পথ, উঁচু গাছ, পাতার নড়াচড়া। শেষে রোমান নেকড়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বোর্হেস গভীর আবেগে রেমুসের মাথায় হাত রাখলেন।
তারপর ক্যাফে তোর্তোনিতে, আয়না, সোনালি অলংকরণ, গরম চকোলেট এবং এক সাহিত্যিক অতীতের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। বোর্হেস তাঁর যৌবনের বুয়েনস আয়ার্সের কথা বলছিলেন—সেই শহর, যার উঠোন তাঁর কবিতায় কলসির মতো অবনত ছিল। এটি পাথরের শহর নয়, শব্দের শহর ছিল। কিন্তু শব্দের তৈরি শহর কি পাথরের শহরের চেয়ে কম বাস্তব? অনেক সময় একটি শহর তার বাড়িঘর হারিয়ে ফেলে, কিন্তু তার ভাষা থেকে যায়। তখন ভাষাই হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় ভূগোল।
সেদিন তাঁর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বোর্হেসের বিষণ্নতা লেখককে বিস্মিত করেছিল। আর্জেন্টিনার গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে তিনি আনন্দিত ছিলেন, কিন্তু চারপাশের বাস্তবতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। খ্যাতি একজন লেখককে কখনো কখনো তাঁর নিজের সময়ের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তখন তাঁকে ঘিরে থাকে দুই বিপজ্জনক শক্তি—ঈর্ষা এবং ভক্তি। দুটিই লেখককে মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না।
হয়তো বোর্হেস নিজের সময়কে আর চিনতে পারছিলেন না। তিনি অন্য এক সময়ের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। লেখকও তা বুঝতেন। মেক্সিকো সিটির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কখনো তাঁর নিজের শহরকেও অপরিচিত মনে হয়েছে। শহর বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু স্মৃতির ভেতর শহরটি থেকে যায়। বাস্তব এবং স্মৃতির মধ্যে এই দূরত্বই হয়তো সাহিত্য।
বোর্হেস একদিন বলেছিলেন, তিনি অন্য কোথাও গিয়ে মরতে চান—হয়তো জাপানে। তিনি বৌদ্ধ ছিলেন না, কিন্তু শূন্যতার ধারণা তাঁকে আকর্ষণ করত। শূন্যতা যদি অনুভূতি হয়, তা ভীতিকর; কিন্তু যদি ধারণা হয়, তা আমাদের শান্ত করতে পারে। কারণ ধারণা আমাদের মৃত্যু থেকে মুক্তি দেয় না, কিন্তু মৃত্যুকে ভাবার একটি ভাষা দেয়।
শেষের দিকে নিউইয়র্কে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল। একই হোটেলে কয়েক দিন ছিলেন। একসঙ্গে খাওয়া, এলিয়ট ওয়াইনবার্গারের সঙ্গে যোগ দেওয়া, চীনা কবিতা নিয়ে কথাবার্তা। শেষে বোর্হেস রেয়েস ও লোপেস ভেলার্দের কথা তুললেন। লেখক ভেলার্দের কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করলেন। বোর্হেস হঠাৎ থেমে জিজ্ঞেস করলেন—
“কিন্তু এর অর্থ কী?”
লেখক কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। বললেন, রূপক ছাড়া বোঝানো কঠিন।
তিনি মাথা নাড়লেন। কথাটি একই সঙ্গে যথেষ্ট এবং অযথেষ্ট। একটি স্বাদের ভাষা নেই, যেমন একটি মুহূর্তেরও ভাষা নেই। আমরা যা সরাসরি অনুভব করি, তাকে প্রকাশ করাই কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন। অনন্তকাল ব্যাখ্যা করা যেমন কঠিন, তেমনি এক মুহূর্তের স্বাদও।
বোর্হেসের মৃত্যু লেখককে সেই পুরোনো সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছিল: মৃত্যুর জন্য আমরা সারাজীবন প্রস্তুত হই, কিন্তু মৃত্যু কখনো প্রস্তুত হয়ে আসে না। আমরা তার অপেক্ষা করি, অথচ সে এলে তাকে অবিশ্বাস করি। ছিয়াশি বছর বয়সও মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট বয়স নয়। কেউই আসলে যথেষ্ট বয়সে পৌঁছায় না। আমরা সবাই সময়ের গাছ থেকে একটু আগে পেড়ে নেওয়া ফল।
বোর্হেস আবার সেই মানুষটিতে ফিরে গেছেন, যাকে লেখক তরুণ বয়সে পড়েছিলেন—কয়েকটি বই, কিছু কবিতা, কিছু গল্প, কিছু প্রবন্ধ। খ্যাতির মুখোশ সরে গেছে। থেকে গেছে লেখা।
তিনি তিনটি প্রধান রূপে লিখেছেন—প্রবন্ধ, কবিতা ও ছোটগল্প। কিন্তু এই বিভাজন তাঁর ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর প্রবন্ধে গল্পের গতি, গল্পে কবিতার ঘনত্ব, কবিতায় প্রবন্ধের চিন্তা। তিনটির মধ্যে যে সেতু, তা হলো চিন্তা।
বোর্হেস ছিলেন অধিবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট এক মন। বার্কলি, লাইবনিজ, স্পিনোজা, ব্র্যাডলি, বৌদ্ধ দর্শনের নানা ধারা তাঁকে আকর্ষণ করত। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন সংশয়বাদী। যুক্তি তাঁকে মুগ্ধ করত, আবার যুক্তির নির্মিত প্রাসাদগুলোর ভঙ্গুরতাও তিনি দেখতে পেতেন। হিউম ও শোপেনহাওয়ার, চুয়াং-ত্সু ও সেক্সটাস এমপিরিকাস তাই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
এই দ্বৈততাই বোর্হেসকে বোঝার চাবিকাঠি। তিনি সত্যের সন্ধান করেছেন, কিন্তু সত্যকে কখনো স্থির অবস্থায় পাননি। একটি ধারণার দরজা খুললেই তার ভেতর থেকে আরেকটি ধারণা বেরিয়ে এসেছে। স্রষ্টার দিকে এগিয়ে গেলে শূন্যতা; শূন্যতার দিকে এগোলে বহুত্ব; নিজের দিকে ফিরলে আরেকজন বোর্হেস।
তাই তাঁর লেখায় আয়না বারবার ফিরে আসে। আয়না আমাদের মুখ দেখায়, কিন্তু একই সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে মুখটি একটি প্রতিচ্ছবি। আমরা নিজেদের যে ‘আমি’ বলে চিনতে চাই, তা কি সত্যিই এক? নাকি প্রতিটি মুহূর্তে জন্ম নেওয়া বহু ‘আমি’-এর একটি সাময়িক সমাবেশ?
বোর্হেসের কাছে পরিচয় ছিল একটি প্রশ্ন, উত্তর নয়।
তাঁর প্রবন্ধের শক্তি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারে নয়, বরং পুরোনো ধারণাকে নতুন আলোয় দেখায়। তাঁর লেখায় সংক্ষিপ্ততা একটি নৈতিক গুণের মতো। তিনি বেশি বলতে চাননি; বরং অল্প কথায় একটি চিন্তার গভীরতা উন্মুক্ত করতে চেয়েছেন। সরলতা ও অদ্ভুততা—এই দুই বিপরীত শক্তিকে তিনি পাশাপাশি রেখেছিলেন। ফলে তাঁর লেখা একই সঙ্গে স্বচ্ছ এবং রহস্যময়।
তাঁর বিশ্বজনীনতা নিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল: তিনি কি সত্যিই লাতিন আমেরিকার লেখক? প্রশ্নটির মধ্যেই একটি ভুল ধারণা আছে। একজন লেখক তাঁর দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নন, কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে দেশ, জাতি বা শ্রেণির পরিচয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং কখনো কখনো কোনো ভূখণ্ডের গভীরতম পরিচয় তাঁর বিশ্বকে দেখার পদ্ধতিতে প্রকাশিত হয়।
লাতিন আমেরিকা ইউরোপীয় ঐতিহ্যের অংশ, আবার তার বাইরে। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁকে পশ্চিমকে এক দূরত্ব থেকে দেখতে দিয়েছে। ইউরোপীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রের মানুষ যেখানে নিজের ঐতিহ্যের ভেতর থেকে কথা বলে, লাতিন আমেরিকান লেখক অনেক সময় একই ঐতিহ্যকে বাইরে ও ভেতর—দুই দিক থেকেই দেখতে পারেন। বোর্হেসের বিশ্বজনীনতা তাই তাঁর লাতিন আমেরিকান পরিচয়কে মুছে দেয় না; বরং তারই একটি ফল।
তবু তাঁর লেখায় আর্জেন্টিনা অনুপস্থিত নয়। বরং তাঁর উপস্থিতি কখনো খুব গভীর। বুয়েনস আয়ার্সের গলি, ছুরি, গাউচো, পুরুষের অহংকার, রাস্তার হিংসা—এসব তাঁর কল্পনায় বারবার ফিরে আসে। একদিকে বার্কলি, অন্যদিকে ছুরি হাতে দাঁড়ানো মানুষ; একদিকে ডান্স স্কোটাস, অন্যদিকে মেসেদোনিও ফের্নান্দেস। যেন একই মনের মধ্যে দুটি মহাবিশ্ব বাস করছে।
এই দ্বৈততা তাঁর সাহিত্যিক প্রকৃতিরও অংশ। সভ্যতা ও বর্বরতা, যুক্তি ও প্রবৃত্তি, গ্রন্থাগার ও রাস্তা—তিনি এদের কোনো একটিকে বেছে নেননি। বরং তাদের সংঘর্ষ থেকেই তাঁর সাহিত্য তৈরি হয়েছে।
তরুণ বয়সে তিনি সাহিত্যিক অ্যাভাঁ-গার্দের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাঁর রুচি বদলেছে, কিন্তু বিদ্রূপের শক্তি হারাননি। প্রথমে তিনি পুরোনো রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লিখেছেন; পরে নতুন বিপ্লবী মতাদর্শের রক্ষণশীলতাকেও আক্রমণ করেছেন। তাঁর কাছে কোনো মতবাদই সাহিত্যিক প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ছিল না।
তাঁর পাঠের বিস্তার ছিল অসাধারণ। গাউচো কবিতা থেকে স্ক্যান্ডিনেভীয় সাগা, ভারতীয় ও চীনা চিন্তা, আরব ও পারস্যের সাহিত্য—সবকিছু তিনি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই বহুত্ব তাঁর লেখাকে বিশৃঙ্খল করেনি। কারণ তাঁর কল্পনা ছিল সংযোগের ক্ষমতা। তিনি দূরের দুটি জিনিসের মধ্যে এমন একটি সেতু দেখতে পেতেন, যা অন্যেরা দেখতে পেত না।
এবং তাঁর বুদ্ধি জানত, সেই সেতুর ওপর কতটুকু বহন করা সম্ভব।
এই কারণেই তাঁর সাহিত্য জ্ঞানভাণ্ডারের প্রদর্শনী নয়। তাঁর জ্ঞান সক্রিয়। তিনি ইতিহাসবিদের মতো সবকিছু সংরক্ষণ করেননি; লেখকের মতো বেছে নিয়েছেন। কিছু রেখেছেন, বাকিটা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যিক পছন্দ ছিল প্রেমের মতো তীব্র, আবার যুক্তির মতো নির্মম।
নিজের বিচারেও তিনি সবসময় নির্ভুল ছিলেন না। তাঁর রুচি কখনো তাঁর প্রতিভার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। তিনি দান্তে নন, হুইটম্যান নন, ভেরলেনও নন। তাঁর সঙ্গে গ্রাসিয়ান, কোলরিজ, ভালেরি কিংবা চেস্টারটনের কিছু আত্মীয়তা আছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব তুলনাও অপ্রয়োজনীয়।
তাঁর কবিতাও এমন। তিনি স্প্যানিশ কবিতার ছন্দ বা বাক্যগঠন বিপ্লবের মতো বদলে দেননি। তবু তাঁর কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি পড়লেই বোঝা যায়, এগুলো অন্য কারও হতে পারে না। তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতায় শব্দ যেন নির্মিত নয়, হঠাৎ আবির্ভূত। কোনো অজানা উৎস থেকে আলো এসে পড়েছে।
তাঁর গল্পের শক্তিও ফর্মের বিপ্লবে নয়। তাঁর গদ্য না প্রুস্তের মতো দীর্ঘ, না হেমিংওয়ের মতো কাটা-কাটা। তাঁর সৌন্দর্য ভারসাম্যে। তিনি একটি পরিস্থিতিকে এমনভাবে নির্মাণ করেন, যাতে তা বাস্তবের চেয়ে একটু বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে।
এখানেই তাঁর শক্তি, আবার সীমাও। তাঁর গদ্যে একটি মুহূর্তকে অসাধারণভাবে ধরা যায়; কিন্তু দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস, বহুস্তরীয় আবেগ, একটি মানুষের পূর্ণ জীবন—এসবের জন্য উপন্যাসের বিস্তার দরকার। বোর্হেস সেই বিস্তারের দিকে খুব বেশি এগোননি।
তিনি বরং বিন্দুর মধ্যে অসীমকে ধরতে চেয়েছেন।
তাঁর সাহিত্যিক আদর্শ ছিল সীমিত ও স্বচ্ছ রূপ। তিনি জানতেন, অসীমকে প্রকাশ করতে অসীম আকারের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি পৃষ্ঠাই যথেষ্ট। একটি বাক্য। একটি আয়না। একটি গোলকধাঁধা। একটি তীর।
আধুনিক কবিতার একটি প্রবণতা ছিল সমগ্র পৃথিবীকে ধারণ করার চেষ্টা। এলিয়ট, পাউন্ড এবং তাদের সমসাময়িকদের দীর্ঘ কবিতাগুলো যেন আমাদের যুগের মহাকাব্য, এক নতুন ‘ডিভাইন কমেডি’ নির্মাণের প্রচেষ্টা। বোর্হেস অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ক্ষুদ্র রূপে বৃহৎ সময়কে ধারণ করতে চেয়েছেন।
এই কারণেই তাঁর অনেক কবিতা আসলে পুরোনো কবিতার নতুন পাঠ। হোমার, দান্তে, সার্ভান্তেস—তিনি তাঁদের পুনরায় পড়েছেন নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে। এবং সেই দৃষ্টিকোণই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তিনি আমাদের পরিচিত জিনিসকে অপরিচিত করে তোলেন, যাতে আমরা তাকে নতুন করে দেখতে বাধ্য হই।
তাঁর সংশয় তাই ধ্বংস করে না। সংশয় তাঁর কাছে সৃষ্টির একটি পদ্ধতি। তিনি পৃথিবীকে প্রশ্ন করেন, এবং প্রশ্নের মধ্য থেকেই আরেকটি পৃথিবী জন্ম নেয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সব প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় এক জায়গায়—সময়ের সামনে।
সময় ও তাকে অতিক্রম করার মানুষের আকাঙ্ক্ষা। অনন্তকাল এবং তার ভয়। পুনরাবৃত্তি। স্মৃতি। বার্ধক্য। পরিচয়ের ক্ষয়। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা। মৃত্যুকে জয় করেও সময়কে জয় করতে না পারা।
সম্ভবত বোর্হেসের সমস্ত সাহিত্যকে একটি মাত্র বাক্যে নামিয়ে আনা যায়— মানুষ সময়ের মধ্যে নিজেকে খুঁজছে এবং প্রতিবারই নিজের বদলে অন্য কাউকে আবিষ্কার করছে।
আমরা যে মানুষটি গতকাল ছিলাম, সে আজ আর নেই। তবু আমরা তাকে ‘আমি’ বলে ডাকি। স্মৃতি তাকে ধরে রাখে, ভাষা তাকে নাম দেয়, কিন্তু সময় তাকে ক্রমাগত বদলে দেয়। এই পরিবর্তনের মধ্যেই পরিচয়ের মায়া।
বোর্হেসের গল্প ও কবিতার অসংখ্য রূপ তাই একই প্রশ্নের চারপাশে ঘোরে। মানুষ সময়ের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। পরিবর্তন আসলে পুনরাবৃত্তির আরেক নাম হয়ে ওঠে। আয়নায় নিজেকে দেখতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে, তার মুখ স্থির নয়। অনন্তকালকে পেতে গিয়ে সে বুঝতে পারে, অনন্তকালও এক ধরনের কারাগার হতে পারে।
এই কারণে বোর্হেসের সাহিত্য একই সঙ্গে বুদ্ধির এবং কল্পনার সাহিত্য। সেখানে ধারণা আছে, কিন্তু ধারণা কখনো নিছক দর্শন হয়ে ওঠে না; কল্পনা আছে, কিন্তু কল্পনা কখনো যুক্তিহীন স্বপ্নে পরিণত হয় না। দুটির মধ্যে যে উত্তেজনা, সেখানেই তাঁর শিল্প।
অধিবিদ্যাবিদ ও সংশয়বাদীর বিরোধের কোনো শেষ সমাধান নেই। কিন্তু সেই অসম্ভব বিরোধ থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন স্বচ্ছ, কঠোর, প্রায় জ্যামিতিক সাহিত্যিক জগৎ। সেখানে শব্দগুলো পাথর নয়, আবার কেবল বাতাসও নয়। তারা এমন এক স্থাপত্য তৈরি করে, যেখানে চিন্তা এবং স্বপ্ন একই ঘরে বাস করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তাঁর রচনার প্রতিটি পথ আমাদের ফিরিয়ে আনে সময়ের কাছে। মানুষ যা নির্মাণ করে, মানুষ নিজেও, সবই সময়ের ক্ষণস্থায়ী বিন্যাস।
‘সময়ই সেই পদার্থ, যা দিয়ে আমি তৈরি।’
এই বাক্যের পরে আর বেশি কিছু বলার নেই। কারণ সময় আমাদের বাইরে দিয়ে বয়ে যায় না। আমরা তার ভেতরেই তৈরি। নদী আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু আমরাই সেই নদী। আগুন আমাদের পুড়িয়ে দেয়, কিন্তু আগুনটিও আমাদেরই অস্তিত্বের অংশ।
কবিতার কাজ সম্ভবত সেই সত্যটিকে দৃশ্যমান করা, যা সময়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে। একটি মুহূর্তকে এমনভাবে দেখা, যাতে তার মধ্যে অনন্তের আভাস পাওয়া যায়। একটি আয়নায় তাকিয়ে বোঝা, প্রতিচ্ছবিটি আমরা নই—তবু তাকে ছাড়া নিজেদের চিনতে পারি না।
একটি তীর ছুড়ে বুঝতে পারা, তীরন্দাজ, তীর ও লক্ষ্য—তিনটি আলাদা বস্তু নয়।
মানুষই তীরন্দাজ। মানুষই তীর। মানুষই লক্ষ্য।
আর সময়—সম্ভবত সেই অদৃশ্য স্থান, যেখানে তিনটিই এক মুহূর্তের জন্য মিলিত হয়।
















