অন্যান্য

আফ্রিকা মহাদেশের বিভাজন ও নতুন মহাসাগর সৃষ্টির সম্ভাবনা

প্রতিবেদক
সব খবর

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৩৯ আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৪৩

আফ্রিকা মহাদেশ বর্তমান ধারণার চেয়েও দ্রুত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব আফ্রিকার সক্রিয় রিফট বা ভূত্বক বিচ্ছিন্ন হওয়ার অঞ্চলটি এখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মহাদেশীয় বিভাজনের স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে। কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত তুরকানা রিফট জোনে ভূত্বক এতটাই পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে এই অঞ্চলটি আফ্রিকা মহাদেশের একটি অংশকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে দিতে পারে। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতিতে সেখানে নতুন একটি মহাসাগরীয় অববাহিকা তৈরি হওয়া সম্ভব। তবে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এটি কোনো নিকট ভবিষ্যতের ঘটনা নয় এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা ঘটতে কয়েক মিলিয়ন বছর সময় লাগতে পারে।

ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় দুটি টেকটোনিক প্লেট যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তখন ভূত্বক প্রসারিত ও পাতলা হতে থাকে। পূর্ব আফ্রিকার রিফট সিস্টেম এই প্রক্রিয়ার একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে আফ্রিকার নুবিয়ান ও সোমালি প্লেট ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এর উত্তরে আরবীয় প্লেটের সঙ্গে সংযোগস্থলে আফার অঞ্চলে রিফটিং প্রক্রিয়া আরও অগ্রসর হয়েছে এবং সেখানে মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরির পর্যায় শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক উচ্চ-রেজল্যুশনের ভূকম্পন-তথ্য ও ভূতাত্ত্বিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তুরকানা রিফটের কেন্দ্রীয় অক্ষের নিচে ভূত্বকের পুরুত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যেখানে রিফটের বাইরের অক্ষত অঞ্চলে এর পুরুত্ব ৩৯ কিলোমিটারেরও বেশি।

এই অবস্থাকে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় ‘নেকিং’ বা গ্রীবার মতো সরু হয়ে আসা বলা হয়। তুরকানা অঞ্চলে এই নেকিং প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে, আর পুরো ইস্ট আফ্রিকান রিফট-সম্পর্কিত বিচ্ছিন্নতা শুরু হয় প্রায় ৪৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে। গবেষকদের মতে, এটি কোনো হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং কোটি কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারাবাহিক ফল। তুরকানা রিফটের পরবর্তী সম্ভাব্য ধাপ হলো ‘ওশেনাইজেশন’ বা মহাসাগরীয়করণ, যেখানে ভূত্বক ভেঙে ম্যাগমা উঠে এসে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক তৈরি করবে। বর্তমানে তুরকানা অঞ্চলে বছরে ৪.৭ মিলিমিটার হারে বিচ্ছিন্নতা ঘটছে, যা মানুষের জীবদ্দশায় লক্ষ্য করা অসম্ভব হলেও দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে এটি বিশাল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

তুরকানা রিফট অঞ্চলটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর জীবাশ্মের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রিফটিংয়ের ফলে ভূখণ্ড নিচু হয়ে যাওয়ায় সেখানে বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে, যা জীবাশ্ম সংরক্ষণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এই অঞ্চলকে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা একটি প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে দেখছেন, যা মহাদেশ কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয় তা বোঝার সুযোগ করে দিচ্ছে। যদিও আফ্রিকা মহাদেশের এই পরিবর্তন চলমান, তবে এটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়। পৃথিবীর বর্তমান মানচিত্র চিরস্থায়ী নয় এবং অতীতে সুপারমহাদেশ প্যানজিয়া ভেঙে আজকের মহাদেশগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। তুরকানা রিফটের এই গবেষণা পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদী ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি চলমান অধ্যায়কে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

সব খবর