নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতি আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য ঋণসংকট আগেভাগে শনাক্ত করতে নতুন একটি কাঠামো আনছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থা দুটির নির্বাহী পর্ষদ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে যৌথ ঋণ টেকসই মূল্যায়ন কাঠামো (ডিএসএফ) সংস্কারের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই নতুন পদ্ধতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ এবং জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়গুলোকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণের উৎস ও ধরনে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সংস্কার আনা হচ্ছে। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যৌথভাবে কাঠামোটি পর্যালোচনা করেছে। সংস্থা দুটির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, বর্তমান পদ্ধতি ঋণসংকটের পূর্বাভাস দিতে কার্যকর হলেও পরিবর্তিত ঋণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এর কিছু অংশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নতুন কাঠামোয় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ঋণের ঝুঁকি আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। এ জন্য একটি আলাদা ‘ডোমেস্টিক ডেট মডিউল’ যুক্ত করা হচ্ছে, যা সরকারের ঋণ ও ব্যাংক খাতের পারস্পরিক নির্ভরতা থেকে তৈরি ঝুঁকিও বিবেচনায় নেবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য কোনো দেশের কতটা আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তা নির্ধারণে পৃথক বিশ্লেষণ যুক্ত হবে।
ঋণ বহনের সক্ষমতা নির্ধারণেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে ঋণসংকটের ঝুঁকি এবং ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়—এ দুটি বিষয়কে আরও স্পষ্টভাবে আলাদা করা হবে। ঝুঁকি পরিমাপের সীমা পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি পূর্বাভাসের বাস্তবতা যাচাইয়ে ‘স্ট্রেস টেস্ট’ আরও শক্তিশালী করা হবে। অর্থনৈতিক ধাক্কা, রাজস্ব কমে যাওয়া কিংবা অর্থায়নের ব্যয় বেড়ে গেলে কোনো দেশের ঋণ পরিস্থিতি কীভাবে বদলাতে পারে, এসব পরিস্থিতিও বিশ্লেষণে গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া সরকারি ঋণের তথ্যের পরিধি, মান ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি খাতের বিভিন্ন দায় যথাযথভাবে ঋণ হিসাবের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে অতিরিক্ত আশাবাদ যাতে ঝুঁকি মূল্যায়নকে দুর্বল না করে, সে জন্য বাস্তবতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।
তবে ঋণ মূল্যায়নে ব্যবহৃত ডিসকাউন্ট রেট ৫ শতাংশই থাকছে। সংস্থা দুটি জানিয়েছে, বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা তৈরির পরিবর্তে প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে সংস্কার আনা হচ্ছে। এতে বর্তমান পদ্ধতির কার্যকর দিকগুলো বজায় রেখেই পরিবর্তিত বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, ২০০৫ সালে চালুর পর ডিএসএফ বিভিন্ন দেশে ঋণসংকটের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০১৭ সালের পর নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি অর্থায়নের উৎসও আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। অনেক দেশ এখন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের পাশাপাশি বাণিজ্যিক শর্তেও ঋণ নিচ্ছে, ফলে আগের তুলনায় ঋণঝুঁকির ধরন আরও জটিল হয়েছে।
নতুন কাঠামোটি ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে এবং দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ততদিন পর্যন্ত বর্তমান কাঠামোই বহাল থাকবে।
এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি উন্নয়ন, অবকাঠামো, মানবসম্পদ ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো খাতে বিনিয়োগের জন্য কোনো দেশের কতটা আর্থিক পরিসর রয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন করা যাবে।
















