মৌলভীবাজারে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে আগাম ও রবি মৌসুমে টমেটো চাষে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও স্থানীয় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। তাদের অভিযোগ, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একইসঙ্গে বিদেশ থেকে টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানির প্রভাবেও স্থানীয় বাজারে দাম কমেছে বলে দাবি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের।
জেলায় সবচেয়ে বেশি টমেটো চাষ হয় কমলগঞ্জ উপজেলায়। এখানকার উৎপাদিত টমেটো ও গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। কৃষকদের অভিযোগ, জেলায় টমেটো সংরক্ষণের জন্য কোনো পৃথক হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। ফলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় বাধ্য হয়ে কম দামে টমেটো বিক্রি করতে হয়, এতে তারা উৎপাদনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কমলগঞ্জে ক্লাস্টারভিত্তিক চাষ ও মালচিং পেপার ব্যবহার করে আগাম টমেটো উৎপাদনে কৃষক ও উদ্যোক্তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন, যা এখন জেলার অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। খরিপ-১, রবি ও গ্রীষ্ম—তিন মৌসুমেই টমেটো চাষ হচ্ছে, যার মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে আগাম জাতের টমেটো চাষে সবচেয়ে বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ১,২০০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমে টমেটো চাষ হয়েছে। এছাড়া খরিপ-১ মৌসুমে ১৩০ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন চাষে ১৯ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ হয়েছে। একই সময়ে ৬৫ লাখের বেশি গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদিত হয়েছে, যা প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, সার ও কীটনাশকের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাজারে থাকা অনেক কীটনাশক ব্যবহার করেও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা আরো জানান, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে এসে টমেটো ক্ষেত বা গ্রাফটিং চারার খোঁজ-খবর নেন না এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন না। সরকারি প্রণোদনা থেকেও তারা বঞ্চিত, ফলে উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। ধলাই ও গোপলা নদীর ভাঙনে অনেকের টমেটো ক্ষেত ও চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি টমেটো গাছে রোগ দেখা দেওয়ায় অনেক ক্ষেতের গাছ তুলে নতুন করে রোপণ করতে হয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়িয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না।
কৃষকদের দাবি, ভারত থেকে টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানিতে শুল্ক শিথিল করায় দেশি উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত বছর এ সময় আগাম টমেটো ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এবার তা মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার শুকুরউল্লাগাঁও গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল মান্নান চলতি মৌসুমে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে আগাম টমেটো চাষ করেছেন, যাতে তার প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও গত বছরের তুলনায় অনেক কম দামে টমেটো বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা ও স্বল্প সুদে ঋণের সুযোগ না থাকায় কৃষকদের সংকট আরো গভীর হচ্ছে। আব্দুল মান্নানের দাবি, শুধু কমলগঞ্জ উপজেলাতেই গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন ও টমেটো চাষ থেকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা জরুরি।
স্থানীয় আব্দুল করিম, জলিল, আব্দুল মতিনসহ অনেক কৃষক জানান, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারায় ফলন ভালো হওয়ায় দিন দিন এ চাষে তাদের আগ্রহ বাড়ছে। কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন, বিশেষ করে আদমপুর, মাধবপুর ও ইসলামপুর এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন টমেটোর আবাদ। পাশাপাশি অসংখ্য গ্রাফটিং চারার শেড গড়ে উঠেছে। অনেক পরিবার নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।
টমেটো চাষকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশের চা-বাগানগুলোর নারী-পুরুষ শ্রমিকরা বাগানে কাজ না থাকলে টমেটো ক্ষেত ও গ্রাফটিং চারার কাজে যুক্ত হচ্ছেন। চা শ্রমিকরা জানান, টমেটো ক্ষেতে কাজ করে নারীরা দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। এতে অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং তাদের সংসার চালানো সহজ হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম টমেটোর আবাদ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬০ থেকে ৬৫ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন করেছেন কৃষকরা, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হয়েছে। তিনি জানান, তিত বেগুনের গাছের সঙ্গে গ্রাফটিং করে টমেটোর চারা উৎপাদন করলে গাছ সহজে ভেঙে পড়ে না বা নেতিয়ে যায় না, একইসঙ্গে ফলনও বেশি হয়। এ কারণে গ্রাফটিং চারার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে টমেটো চাষিদের প্রণোদনা ও নদীর বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কমলগঞ্জ উপজেলা কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার তালুকদার। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৩৮০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যার কাজ এখনো চলমান রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জালাল উদ্দিন জানান, হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জনবল সংকট থাকায় সব সময় কৃষকের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। নিম্নমানের ওষুধে প্রতারণার অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, টমেটোর পাতা মরা ও কুঁকড়ে যাওয়া রোগ দমনে আক্রান্ত গাছ অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার সুবিধা পেলে এ খাত আরো এগিয়ে যাবে।

















