পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদন প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরে শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা পিছিয়ে যায়।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ ভাল্ভগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু করতে এই পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তা কমিয়ে নিরাপদ অবস্থায় রাখতে নিরাপত্তা ভাল্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেই পরীক্ষাগুলো চালানো হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ—উভয় স্থান থেকেই পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়েছে। এতে প্রথম ইউনিটের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত চাপ কমানোর পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ভাল্ভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্কসংকেত এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় চাপ ও তাপমাত্রার তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে নিরাপত্তা ভালভের ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপের পরীক্ষাটি করা হয়, যা মঙ্গলবার রাতে শুরু হয়েছিল। খুব শিগগির ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে আরেকটি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, মেগাপ্যাসকেল হলো চাপের মাত্রা। পারমাণবিক চুল্লিপাত্রে স্বাভাবিক চাপ হলো ১৬ মেগাপ্যাসকেল। এটি সফল হওয়ার অর্থ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালানো যাবে। তবে অবশ্যই আরও উচ্চ চাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তাই ১৮ মেগাপ্যাসকেলে পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা অবাস্তব নয়, চাইলে তা অর্জন করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক জ্বালানি পাওয়া সহজলভ্য নয়, তাই আগে থেকে মজুত করে রাখতে হয়। প্রথম ইউনিট থেকে শক্তি উৎপাদন শুরুর পর কোনো জ্বালানি অ্যাসেম্বলি কাজ না করলে সঙ্গে সঙ্গে তা বদলাতে হবে। এ কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের আগে দ্বিতীয় ইউনিটের সব জ্বালানি রূপপুরে রাখতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রথম ইউনিটের সব জ্বালানি ২০২৩ সালেই রূপপুর পৌঁছায় এবং চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শেষ হয় গত মে মাসে। গত শুক্রবার রাতে প্রথম ইউনিটের জন্য একটি অতিরিক্ত চালান এসেছে, যা শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছায়। দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি তৈরি আছে এবং আগামী বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান দেশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে এ দফায় মোট ৯টি চালান আসার কথা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, একটি ত্রুটির কারণে দুই মাস পিছিয়ে যেতে হয়েছে। এখন সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে। জ্বালানি নিয়েও কোনো অনিশ্চয়তা নেই। প্রতি সপ্তাহে একটি করে জ্বালানির চালান আসার কথা রয়েছে। অল্প কিছু পরীক্ষা শেষ হলেই পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুর পর টানা ৭-৮ মাস চলতে পারে পরীক্ষামূলক উৎপাদন। তবে গ্রিডে বিদ্যুৎ গেলেই বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হবে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠে বাংলাদেশের।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীনে পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, তবে খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে, যা প্রকল্পের মোট খরচ ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠে বাংলাদেশের।২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ।

















