দেশে যখন কর্মসংস্থানের বাজারে তীব্র সংকট চলছে, তখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও নিয়োগপত্র পাওয়ার পর ৯১৮ জন প্রার্থী চাকরিতে যোগদান করেননি। সরকারি চাকরিকে যেখানে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিরাপদ মনে করা হয়, সেখানে এত বড় সংখ্যার প্রার্থীর যোগ না দেওয়ার ঘটনাটি সংশ্লিষ্টদের অবাক করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই পদের বেতনকাঠামো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ২০২৬ সালের নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী, ১৩তম গ্রেডের এই পদে শুরুতে ভাতাসহ সর্বনিম্ন প্রায় ৩৬ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও এত প্রার্থীর অংশ না নেওয়ার পেছনে তারা অন্য কোনো ভালো চাকরিতে যুক্ত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ১ অক্টোবর ছিল যোগদানের নির্ধারিত দিন। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৬১ জেলায় মোট ১৪ হাজার ৪শ’র কাছাকাছি পদের বিপরীতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৩১ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। আর ৫৫৩ জন প্রার্থী পরবর্তী ধাপেই অংশ নেননি অর্থাৎ কোনো কাগজপত্রই জমা দেননি। কাগজপত্র যাচাইয়ের পর ১৩ হাজার ৭৪৮ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৩০ জন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। ফলে নিয়োগপত্র পেয়েও ৯১৮ জন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানান, নয় শতাধিক প্রার্থী সহকারী শিক্ষক পদে যোগ না দেওয়ায় অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, চাকরিতে যোগ দেওয়া না–দেওয়া সবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। ধারণা করা যায়, এসব প্রার্থী হয়তো এর চেয়ে ভালো চাকরি পেয়েছেন বা একই সময়ে একাধিক চাকরির চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত পছন্দেরটি বেছে নিয়েছেন। সাধারণত সব চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রেই এমনটি কমবেশি হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম জেলার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ৫৫১ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি ৫২৭ জনের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৬৪ জন প্রার্থী চাকরিতে যোগ দেননি। বর্তমানে যোগদানকারী নতুন শিক্ষকদের উপজেলা পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন বা পরিচিতিমূলক কার্যক্রম চলছে এবং আগামী ১১ অক্টোবর তাদের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হবে। নির্ধারিত সময়ে যারা যোগ দেননি, তাদের আর যোগদানের সুযোগ নেই।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পটভূমি বেশ দীর্ঘ। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০২৫-এর ফলাফলের ভিত্তিতে ৬১ জেলায় ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদের বিপরীতে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। এর ভিত্তিতে মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়গুলো যখন প্রথম নিয়োগ তালিকা প্রকাশ করে, তখন সুপারিশ পাওয়া বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর নাম বাদ পড়ে। মূলত গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে এই প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে ছিল। পরবর্তীতে চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে এবং গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকার ধীরে ধীরে বাদ পড়া প্রার্থীদের নিয়োগ তালিকায় যুক্ত করে। তবে এখনও প্রায় ৮০ জনের বেশি প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলাসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এমনিতেই দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষকসংকট চলছে, তার ওপর এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর যোগ না দেওয়া নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে পৌনে চার লাখের মতো শিক্ষক কর্মরত আছেন। বর্তমানে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৩৬ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও কয়েক হাজার পদ খালি। এর মধ্যে গত জুলাইয়ে উচ্চ আদালতের রায়ের পর শূন্য থাকা ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বর্তমান বিধি অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের ৮০ শতাংশ পদ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে এই পদোন্নতি দেওয়া হলে সহকারী শিক্ষকদের শূন্য পদের সংখ্যা আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে, যা প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক পাঠদানকে আরও ব্যাহত করতে পারে।

















