বাংলাদেশ

টঙ্গীতে তরুণদের দল ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ ছিনতাইকারী ধরে চালাচ্ছে অভিযান

প্রতিবেদক
সব খবর

গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ নামে একদল তরুণ ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছে। সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাদের কার্যক্রমের ভিডিও পোস্ট করে পরিচিতি লাভ করেছে। গত ১৬ আগস্ট টঙ্গীতে এই ঘটনা ঘটে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ আনোয়ার ওরফে ‘ব্লেড আনোয়ার’ নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছেন। তরুণরা তাকে টঙ্গীর ছিনতাইকারীদের উদ্দেশে বার্তা দিতে বলেন। আনোয়ার তখন বলেন, ‘টঙ্গীতে কেউ ছিনতাই করতে আইবেন না। মাইর‍্যা হাড্ডি ভাইঙ্যা ফ্যালাইবো।’ ক্যামেরার বাইরে থেকে একজন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘পাবলিক।’ এরপর তরুণরা তাকে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ নামটি বলতে বলেন।

বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ফাহাদ ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, তিনি টঙ্গী সরকারি কলেজের স্নাতক পর্যায়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের সংগঠন মূলত ছিনতাই, মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কাজ করে। জড়িত ব্যক্তিদের হাতেনাতে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। ফাহাদ ইসলামের ভাষ্যমতে, টঙ্গী এলাকায় তাদের দলে ২৫০ জন সদস্য কাজ করছেন এবং সদস্য হওয়ার জন্য প্রায় ৭০০ জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা পড়েছে।

বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশনের ফেসবুক পেজের অনুসারী ৫৪ হাজার। সংগঠনটি নিয়মিত ছিনতাইকারী, মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে তাদের ভিডিও ফেসবুকে দেয়, যা হাজার হাজার ভিউ হয়। দলের সদস্যরা নির্দিষ্ট পোশাক পরে টহল দেন এবং অভিযানে অংশ নেন। পুলিশের সঙ্গেও তাদের পোশাক পরা সদস্যদের দেখা যায়। তাদের হাতে লাঠিসোঁটাও থাকে। তবে কখনো কখনো সন্দেহভাজনদের মারধর ও অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টঙ্গী এলাকাটি দুই থানার (টঙ্গী পূর্ব ও টঙ্গী পশ্চিম) আওতাধীন হওয়া সত্ত্বেও অপরাধ দমনে পুলিশ সফলতা দেখাতে পারছে না। টঙ্গী পূর্ব থানা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ছিনতাই, ছিনতাইচেষ্টা ও ডাকাতির ৭১টি মামলা হয়েছে এবং ৭০২ জন ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় ছিনতাই ও ডাকাতিচেষ্টার ৭২টি মামলা হয়েছে এবং ৪২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা প্রায়ই মামলা করেন না বা থানা-পুলিশ মামলা না নিয়ে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করে, তাই এই পরিসংখ্যান অপরাধের পুরো চিত্র তুলে ধরে না।

টঙ্গীর স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, কলেজ গেট এলাকা, আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড, সাতাইশ, কেরানীরটেক, হাজী মাজার বস্তিসহ কয়েকটি এলাকায় ছিনতাইকারীরা সক্রিয় থাকে। গত ২৬ আগস্ট রাতে সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা শেখ মোহাম্মদ রুসেল ও তার পরিবারকে রংপুরে যাওয়ার পথে কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা তিনজন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে দুটি মুঠোফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় রুসেল টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করলেও ছিনতাই হওয়া কোনো কিছু উদ্ধার হয়নি বা আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।

বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশনের কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সবুজ উদ্দিন ইকবাল জানান, তাদের সদস্যরা অপরাধের তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করেন। পুলিশও তাদের বার্তা দেয় যে কোন এলাকায় অপরাধ বেড়েছে এবং সেখানে টহল দিতে বলে। তিনি বলেন, ‘আমার মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আমরা এ কাজটি করে থাকি।’ সবুজ উদ্দিনের দাবি, তাদের সদস্যদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গাজীপুর মহানগর পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও রয়েছেন। সংগঠনটি গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর (২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয়, সম্ভবত আগের বছর) আত্মপ্রকাশ করে এবং এ পর্যন্ত ২৫০ জনের মতো ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে পুলিশের কাছে দিয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের কাজ কেন তরুণরা করবেন। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, বেসরকারি উদ্যোগে দল গঠন করে অপরাধ দমন গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের চেষ্টা বহুমুখী অপরাধের জন্ম দিতে পারে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, দলের সদস্যরা কাউকে মাদক ব্যবসায়ী ট্যাগ দিয়ে মারধর করে পুলিশে দিতে পারে যদি সে চাঁদা না দেয়।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) দক্ষিণ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের কাজ হলেও জনগণের সহায়তা প্রয়োজন। জনগণের সচেতনতা ও সহায়তা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। তিনি জানান, পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

সব খবর