চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। আগামী ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটি পরিচালনার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ঢাকায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে এই চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশই এই টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালে বিনিয়োগ ও পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। মজার বিষয় হলো, এই তিনটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে যথাক্রমে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশই এই বন্দর দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। বাকি মাত্র ১ শতাংশ পরিবাহিত হয় মোংলা বন্দর দিয়ে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় ও সেবার মান সরাসরি এই বন্দরের কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ১৮৮৮ সালে প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বন্দরটি দেশের সবচেয়ে পুরোনো সমুদ্রবন্দর। এর বাইরে ১৯৫০ সালে মোংলা এবং ২০১৬ সালে পায়রা বন্দর চালু হলেও পায়রায় এখনো কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়নি এবং মোংলায় এই সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। ১৯৭৭ সালের মার্চে চট্টগ্রামে প্রথম কনটেইনার পরিবহন শুরু হয় এবং বর্তমানে লয়েডস লিস্টের বৈশ্বিক তালিকায় কনটেইনার পরিবহনে এই বন্দরের অবস্থান ৬৮তম।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সিসিটি, জিসিবি, এনসিটি এবং পতেঙ্গা নামের চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে সিসিটি ও জিসিবি দেশীয় অপারেটর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তবে সিসিটি টার্মিনালটিও ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে সৌদি আরবের আরএসজিটি এবং দেশীয় এমজিএইচ গ্রুপ প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, তিনটি টার্মিনাল ইতিমধ্যে বিদেশি অপারেটরের হাতে গেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালের (আরএসজিটি) সঙ্গে পতেঙ্গা টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ২২ বছরের চুক্তি হয়, যা ২০২৪ সালের জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। ২০২৫ সালে ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও ৩০ বছর পরিচালনার জন্য চুক্তি হয়, যা শর্তসাপেক্ষে আরও ১৫ বছর বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া বে টার্মিনাল প্রকল্পের দুটি টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং ২০২৯ সালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে প্রাথমিকভাবে তা বন্দর কর্তৃপক্ষেরই পরিচালনা করার কথা রয়েছে।
আগে সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য দেশীয় অপারেটর নিয়োগ করা হতো, যেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল আদায় করে অপারেটরদের বিল পরিশোধ করত। তবে নতুন তিনটি চুক্তি হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় জিটুজি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের পিপিপি আইনে শুরুতে জিটুজি প্রকল্পের বিধান ছিল না। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের নীতি ও ২০১৯ সালের সংশোধিত আইনের অধীনে এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো করা হচ্ছে, যেখানে অপারেটররা নিজেরাই বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে মাশুল আদায় করবে এবং চুক্তি অনুযায়ী বন্দরকে অংশ দেবে।
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, এনসিটি টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন ৫ কোটি ডলার দেওয়া হবে, যার ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের দিন এবং বাকি ৭৫ শতাংশ টার্মিনাল হস্তান্তরের আগে পরিশোধ করতে হবে। চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার একক (টিইইউ) কনটেইনার ওঠানো-নামানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে অপারেটরকে জরিমানা গুনতে হবে। গত অর্থবছরে এই টার্মিনালে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবাহিত হয়েছিল।
এনসিটি থেকে বন্দরের রাজস্ব আয়ের বিষয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, প্রতি কনটেইনারের রাজস্ব আয়ের ৬৭ শতাংশ বন্দর পাবে। তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে বন্দর ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পাবে এবং এর বাইরে বছরে ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি হিসেবে পাবে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, এনসিটিতে কনটেইনারপ্রতি মোট আয় ছিল ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এই হিসাবে ৬৭ শতাংশ হারে বন্দর পাবে প্রায় ১০৮ ডলার ৪২ সেন্ট। তবে বর্তমানে কনটেইনারপ্রতি আয় ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার ধরে হিসাব করলে বন্দরের অংশ দাঁড়াবে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কনটেইনারপ্রতি আয় ১৬০ ডলারের নিচে নামলে তা হতো ৯৩ ডলার ৫০ সেন্ট। অবশ্য এই ধরনের কনসেশন চুক্তির সাধারণত পুরোটা প্রকাশ করা হয় না।
তিনটি বিদেশি চুক্তির মধ্যে বিনিয়োগের ধরনে বড় পার্থক্য রয়েছে। লালদিয়ায় খালি জমিতে এপিএম টার্মিনালস ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করবে, যেখানে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে থাকছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস। সেখানে ৮ লাখ একক পর্যন্ত প্রতি কনটেইনারে বন্দর পাবে ২১ ডলার এবং এর বেশি হলে ২৩ ডলার। পতেঙ্গা টার্মিনালটি বন্দর নিজস্ব অর্থায়নে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছে, যেখানে আরএসজিটি যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করে পরিচালনা করছে এবং প্রতি কনটেইনারে বন্দরকে ১৮ ডলার দিচ্ছে। অন্যদিকে, এনসিটি ইতিমধ্যে সচল ও যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ একটি টার্মিনাল, যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড মূলত আধুনিকায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে। এনসিটি নির্মাণে ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ৫৬৭ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে যন্ত্রপাতিসহ মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। এনসিটিতে আগে থেকেই বন্দরের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকায় এর ব্যবস্থায় ল্যান্ডলর্ড ও টুল পোর্ট–দুই মডেলের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আঙ্কটাডের ‘রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, বিশ্বে সক্রিয় কনটেইনার বন্দরের সংখ্যা ৯৩৭। একই দেশের বিভিন্ন টার্মিনালও ভিন্ন ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে পারে। ড্রিউরি ও মেরিটাইম গেটওয়ের ২০২২ সালের কনটেইনার মার্কেট রিপোর্ট এবং বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরবিষয়ক প্রকাশনায় ভারতের ৩০টি কনটেইনার টার্মিনালের তথ্য রয়েছে।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন। চুক্তি বাতিলের দাবিতে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে এবং অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় সিপিবি ও বাসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভে পুলিশ লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আন্দোলনকারীদের যুক্তি, ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা সচল একটি টার্মিনাল, যার গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলোর মেয়াদ আরও ১৯ থেকে ২৩ বছর রয়েছে, তা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে বন্দরের আর্থিক ক্ষতি হবে এবং শ্রমিকরা চাকরি হারাবেন। তবে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আশ্বস্ত করেছেন যে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারাবেন না। বরং আধুনিকায়ন ও অটোমেশনের ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র তার প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। এই চুক্তির শর্ত বা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা জনগণ জানে না। তবে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে সেবার মান ও প্রফেশনালিজম বাড়বে, তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন মাশুল না বাড়ে। বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলমও এটিকে ইতিবাচক চুক্তি হিসেবে দেখছেন, তবে তিনি বন্দর কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও হিন্টারল্যান্ডে বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শুধু অপারেটর বদলালেই বন্দরের সব সমস্যার সমাধান হবে না। জাহাজ জেটিতে ভেড়ার জন্য জোয়ারের অপেক্ষা এবং গড়ে ১৪ ঘণ্টার ওয়েটিং টাইম একটি বড় সমস্যা। এছাড়া কাস্টমসের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে পণ্য খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগে, যা অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমদানিকৃত কনটেইনারের ৬০ শতাংশ বন্দর চত্বরেই খালি করার কারণে তীব্র যানজট তৈরি হয়। পাশাপাশি সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগের সীমাবদ্ধতাও বন্দরের দক্ষতাকে বাধাগ্রস্ত করে। বর্তমানে রেলপথে মাত্র ৫ শতাংশ এবং নৌপথে ১ শতাংশের কম কনটেইনার পরিবাহিত হয়। তবে দক্ষতার দিক থেকে পতেঙ্গা টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর ঘণ্টায় গড়ে ২০টির বেশি কনটেইনার ওঠানো-নামানো করছে, যেখানে দেশীয় অপারেটরের অধীনে অন্য টার্মিনালগুলোতে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৭টি।

















