ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন যে, ইরানের সরকারকে উৎখাত করাই তাঁর দেশের প্রধান লক্ষ্য। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এবং জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন কমতে দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ইরানে আবারও হামলা চালানোর আভাস দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার সামরিক সক্ষমতা থাকলেও, এই সামরিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে ইরানের সরকার উৎখাত করার কোনো সুস্পষ্ট কৌশল তাদের নেই। শুধু বিমান হামলা চালিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন বলে তারা মনে করছেন. ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান থেকে ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় এসব বোমা ফেলা হয়েছিল।মাটির অনেক গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য এসব বোমা তৈরি করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থল অভিযান চালাতে গেলে অনেক বড় সামরিক প্রস্তুতি ও শক্তির প্রয়োজন হবে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে পাহাড়ের নিচে থাকা ইরানের অস্ত্রের ঘাঁটিতে হামলা চালানো কঠিন হবে, কারণ এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য মার্কিন বাহিনীর যে সক্ষমতা রয়েছে, তা ইসরায়েলের নেই। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলোচনা হয় এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েল সফর করেন। এরপরই নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের কথা বলেন। তবে, ইরানে নতুন করে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিতে রাজি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো ইঙ্গিত দেননি। এমনকি ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করার অভিযানে ওয়াশিংটন যোগ দেবে কি না, তাও স্পষ্ট করেননি।
ইরান ইতিমধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে এবং দেশটির এখনো পাল্টা হামলার সক্ষমতা রয়েছে। ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালাতে সক্ষম, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া মাটির অনেক গভীরে থাকা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো ইসরায়েলের জন্য কঠিন হবে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) গবেষক আরবান কনিংহাম আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুত এবং আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি ভরার সক্ষমতা রয়েছে, যা তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। কনিংহামের মতে, ইসরায়েল আবারও আকাশে আধিপত্য বিস্তার করে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে। তবে, হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতা থাকলেও ইসরায়েল দেশটির সরকার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে।
তুরস্কের কায়সেরি শহরের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক চাগলার কুরচ বলেন, বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা সম্ভব হলেও, তাতে দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বিমান হামলার মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা কমানো যায়। কিন্তু আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা যায় না। ভালোভাবে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রব্যবস্থাগুলো টিকে যাবে।’ তাঁর মতে, ইরানের সরকার উৎখাত করতে হলে সেখানে সেনা মোতায়েন করতে হবে এবং কয়েক বছর ধরে দেশটিতে সেনা রাখার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। আগের হামলাগুলোতে ইসরায়েল যেসব গোপন কৌশল ব্যবহার করেছে, সেগুলো আবারও একইভাবে কার্যকর হবে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কনিংহাম গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায় ও নেটওয়ার্ককে ‘একবার ব্যবহার করেই হারানোর ঝুঁকিতে থাকা সম্পদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এসব কৌশল ব্যবহারের ফলে গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। তখন ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্ত করে সেগুলো শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, ইরানের ভেতরে ইসরায়েলের এখনো ‘মানব গোয়েন্দা’ রয়েছে এবং নতুন কোনো অভিযানে ‘সাইবার হামলা’ও চালানো হতে পারে। তবে এসব সক্ষমতা ব্যবহারের ঝুঁকিও আছে, কারণ এতে গোপন গোয়েন্দাদের পরিচয় ও নেটওয়ার্ক প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।
রুসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের হাতে সম্ভবত এখনো বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তবে দেশটির লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও নির্ধারণের ব্যবস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কার্যকারিতা কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। কৌশল বলেন, ‘ইরানের হাতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্ভবত এখনো অনেক বেশি। কারণ, এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি তুলনামূলক সহজ। পুরোনো চীনা জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের (এএসসিএম) বড় অংশই এখন ইরান নিজ দেশে তৈরি করে। এ ছাড়া ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়গুলো বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রাকৃতিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।’
ইসরায়েলের জন্য নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘ সময় সচল রাখা আরও কঠিন হবে বলে মনে করেন কনিংহাম। কারণ, আগের সংঘাতগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে গিয়ে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অনেক কমে গেছে। বারবার হামলা হলে ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপও পড়বে, কারণ ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে অনেক বেশি দামি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের হামলা ও পাল্টা হামলা চললে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে। ইরান যুদ্ধে চার মাসেই অন্তত ৫২টি যুদ্ধবিমান–ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র.
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে নতুন করে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের তাতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম। এর কারণ হিসেবে তাঁরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থের পার্থক্যের কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে সংঘাত বাড়ানো থেকে বিরত থাকার চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার জন্য ইসরায়েল একটি প্রস্তাব দিয়েছিল ওয়াশিংটনকে, কিন্তু সেই প্রস্তাব ট্রাম্পের অনুমোদন পায়নি। তবে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এখনই হামলা চালানো নিয়ে দুই পক্ষের মতভিন্নতা রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানে হামলার বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
কনিংহাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে মাটির অনেক গভীরে থাকা ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো কঠিন হবে। কারণ, এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তা ইসরায়েলের নেই। এর মধ্যে রয়েছে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের জিবিইউ-৫৭ বাংকারবিধ্বংসী বোমা, যা মাটির অনেক গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক হামলার সক্ষমতা দিয়েছে, যা ইসরায়েলের পক্ষে একা অর্জন করা সম্ভব নয়।
কনিংহাম আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে তেহরান পাল্টা হামলার জন্য মূলত ইসরায়েলের ভূখণ্ডকে বেছে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরান মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এড়িয়ে যেতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারে। এ ধরনের কৌশলের উদ্দেশ্য হবে ইসরায়েলকে শাস্তি দেওয়া, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না ফেলা। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল আরও একঘরে হয়ে পড়তে পারে, কারণ গাজায় দেশটির কর্মকাণ্ডের কারণে ইসরায়েল ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি ইসরায়েলকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারে, তা হলো সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান। ইসরায়েল সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু সেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের রাজনৈতিক ক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। কুরচ বলেন, ‘আপনি যদি সেনা মোতায়েন করতে এবং কয়েক বছর ধরে একটি দেশে অবস্থান করতে প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে সেখানকার সরকার পরিবর্তন করতে পারবেন না। ইসরায়েল একা ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রও আরেকটি সরকার পরিবর্তনের অভিযানে জড়াবে না। কারণ, এমন অভিযানে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।’ এরপর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ওই ইসরায়েল একযোগে হামলা চালায় ইরানে।

















