সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা, নির্দিষ্ট মেয়াদে উচ্চতর গ্রেড এবং পদোন্নতির দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। শিক্ষকদের দাবির ধরন এবং আন্দোলনের কৌশল নিয়ে সংগঠনগুলো এখন ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপির নেতৃত্বাধীন অংশটি গত মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ছয় ধাপের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তাদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন, চাকরির অষ্টম ও চতুর্দশ বছর পূর্তিতে দুটি উচ্চতর গ্রেড প্রদান এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করা। এছাড়া হয়রানিমূলক বদলি বাতিল ও বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন তারা। এই অংশটি ৮ নভেম্বর কালো ব্যাজ ধারণ, দোয়া ও জেলা প্রশাসকদের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে। ১৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং বার্ষিক পরীক্ষা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বা শাহবাগে মহাসমাবেশ ও প্রয়োজনে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন নেতারা।
অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের নেতারা ভিন্ন পথে হাঁটছেন। মাহবুবর রহমান ও বিজয় কর্মকারের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠনটি গত ১৮ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে সরাসরি ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে। তাদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদান এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা। তারা আগামী বছরের ১ জানুয়ারির মধ্যে এই দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। মাহবুবুর রহমান ১০ম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে খায়রুন নাহার লিপির পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে খায়রুন নাহার লিপি এই অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছেন, তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এবং পরিবারের দায় তার ওপর চাপানো অনুচিত। তিনি দাবি করেন, দুপক্ষের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই বরং তারা সবাই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের প্রেস নোট বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন।
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদমর্যাদা ও শূন্যতা একটি বড় সংকট। মন্ত্রণালয় ও বিদ্যালয় শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ হাজার ৪৫৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৫ জন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও সহকারী শিক্ষকের ২৪ হাজার ৫৩৬টি পদ এখনো শূন্য। এর আগে ২০২৫ সালের আন্দোলনের সময় ৪৩ জন শিক্ষক নেতাকে বদলি করা হয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচজন এখনো বদলিস্থলে কর্মরত আছেন। বেতন গ্রেড ও পদোন্নতি নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তারা এখন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সংগঠনটির নেতারা জানান, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তারা হতাশ। সভাপতি মাহবুবর রহমান বলেন, ২০২১ সাল থেকে তারা ১০ম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলন করছেন। পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ স্কুলের সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড দেওয়া হলেও তাদের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
















