নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছেন আর্জেন্টিনা। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২–১ গোলের জয়ের ম্যাচে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে.
রদ্রিগো ডি পলে আর আস্থা নেই কোচ লিওনেল স্কালোনির। টুর্নামেন্টে লিওনেল মেসির প্রথম গোলে ডি পলের অ্যাসিস্ট থাকলেও পুরো বিশ্বকাপে তিনি খুব সাধারণ ফুটবলই খেলেছেন। আর্জেন্টিনার পুরো মিডফিল্ডই এই বিশ্বকাপে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না, তবে এর দায়টা বেশি ডি পলেরই। গতকালের ম্যাচে জুলিয়ানো সিমিওনেকে একাদশে এনে স্কালোনি তাঁর সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন। সিমিওনে দলে গতি ও কাউন্টার অ্যাটাকের শক্তি বাড়িয়েছেন।
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই দুই দলের মধ্যকার বৈরিতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। খেলার শুরু থেকেই বল ছাড়া আর্জেন্টিনার কৌশল স্পষ্ট ছিল, তা হলো প্রতিপক্ষকে ‘বিধ্বস্ত’ করা। মনে হচ্ছিল প্রত্যেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় শতবছরের পুরোনো সেই দক্ষিণ আমেরিকান কৌশলই ব্যবহার করছেন, ‘হয় বল পার হবে, না হয় খেলোয়াড় পার হবে, কিন্তু দুটো একসঙ্গে কখনোই নয়।’ এই কৌশলে আর্জেন্টিনার অন্যতম সেনাপতি ছিলেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। বোকা জুনিয়র্সের এই মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম এবং নিচে নেমে আসা হ্যারি কেইনকে একাই আটকে রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন।
রক্ষণে দুর্বলতা এখনো কাটেনি আর্জেন্টিনার। দলে রাইটব্যাক পজিশনে ভালো বিকল্প না থাকাটা বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সেমিফাইনালে নাহুয়েল মলিনা সেই ভয়টাই সত্যি প্রমাণ করেছেন। টুর্নামেন্ট জুড়েই এই পজিশনে কোচ লিওনেল স্কালোনি বারবার খেলোয়াড় অদলবদল করেছেন। মলিনা গত মৌসুমে মাত্র ১৩টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন। সেমিফাইনালে মলিনা শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে তিনি এক মারাত্মক ভুল করে বসেন, যা আর্জেন্টিনার রক্ষণের আসল কঙ্কালটা বের করে আনে। মর্গান রজার্সের বাড়ানো ক্রসের সময় মলিনা কেবল বলের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। নিজের পেছনে থাকা খেলোয়াড়কে মার্ক করতে ভুলে যান তিনি। এই সুযোগে অ্যান্থনি গর্ডন তাঁর পেছন থেকে এসে আলতো ছোঁয়ায় ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। ফাইনালে স্পেন নিশ্চিতভাবেই আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকদের চেপে ধরবে, বিশেষ করে স্কালোনির অরক্ষিত ডান দিকটাই হবে স্প্যানিশদের প্রধান লক্ষ্য।
প্রথমে গোল খাওয়াটাই আর্জেন্টিনার জন্য শাপেবর হয়েছে। ইংল্যান্ড কোচ গোল পাওয়ার পর দলকে পুরোপুরি ডিফেন্সিভ ও লো ব্লকে নিয়ে যান এবং রক্ষণাত্মক বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে আর্জেন্টিনার চাপকে আমন্ত্রণ জানান। এই জুয়া আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কাজে লাগেনি। গোল হজমের পরই মেসি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এবং আর্জেন্টিনার পাল্টা–আক্রমণ পরিচালনা করতে শুরু করেন। তাঁর কিছু ক্রস থেকে আরও আগেও গোল আসতে পারত। শেষ পর্যন্ত দুটি গোলে তিনিই সহায়তা করেন। মেসির দ্বিতীয় অ্যাসিস্টটা ছিল দুর্দান্ত। ৩৯ বছর বয়সী মেসি উইং ধরে দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে যান। এরপর ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে মার্তিনেজের জয়সূচক গোলের জন্য একটি নিখুঁত ক্রস ভাসিয়ে দেন।
এনজো ফার্নান্দেজ মাঠে আগুন ঝরাবেন, এটা শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। ম্যাচের মাত্র ৩ মিনিটেই এলিয়ট অ্যান্ডারসনের মাথায় আঘাত করে নিজের আগ্রাসী রূপ দেখিয়েছেন তিনি। প্রথম ২৫ মিনিট এই ইংলিশ মিডফিল্ডারকে ফার্নান্দেজ একমুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেননি। গোলের আগেও বেশ কয়েকবার দূর থেকে শটের চেষ্টা করেছেন ফার্নান্দেজ। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে তিনি আসল ম্যাজিকটা দেখান। তাঁর উদ্যাপনটাও ছিল দেখার মতো। ফার্নান্দেজের পাশাপাশি তাঁর মিডফিল্ড সঙ্গী আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারও জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছেন। তাঁর দুটি দুর্দান্ত শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

















