যুক্তরাজ্যের লন্ডনের গণপরিবহন ব্যবস্থা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) ডিজিটাল অবকাঠামোয় নজিরবিহীন সাইবার হামলা চালানোর দায়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ থালহা জুবায়ের (২০) ও তাঁর ব্রিটিশ সহযোগী ওয়েন ফ্লাওয়ার্সকে (১৮) সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্ট এই রায় ঘোষণা করেন। এই সাইবার হামলায় টিএফএলের প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ডের ক্ষতি হয়েছিল এবং কয়েক দিন ধরে লন্ডনের যাত্রীসেবা স্থবির হয়ে পড়েছিল।
বিচারক মার্ক টার্নার রায়ে উল্লেখ করেন, এটি কোনো রাষ্ট্র-সমর্থিত অন্তর্ঘাত ছিল না, বরং ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নামক আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠীর সক্ষমতা প্রমাণের এক ধরনের বেপরোয়া বাহাদুরি ছিল। আসামিরা লাখো মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন। কম্পিউটার মিসইউজ আইনের ৩ জেডএ ধারায় এমন অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও, আসামিদের বয়স এবং জুবায়েরের অটিজম ও ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের মতো নিউরোডাইভারজেন্ট অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত এই সাজা দিয়েছেন। বিচার চলাকালে দোষ স্বীকার করায় তাঁরা সাজার ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছেন।
তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হ্যাকার চক্র টিএফএলের নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে। একপর্যায়ে তাঁরা সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিলে, বড় বিপর্যয় এড়াতে টিএফএল পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়। এর ফলে প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে নতুন করে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা পরিচয়পত্র রিসেট করতে হয়েছিল। অপরাধের সময় ফ্লাওয়ার্স পুরো কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করেন এবং জুবায়ের তা টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে দম্ভোক্তি করেন।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জুবায়েরের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ও অনলাইন লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করেই তাঁর অনলাইন পরিচয় ও পূর্ব লন্ডনের বাসার ঠিকানা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে তাঁর বাসা থেকে একটি বাংলাদেশি পাসপোর্টও উদ্ধার করে। জুবায়েরের বিরুদ্ধে কিশোর বয়স থেকেই অনলাইন প্রতারণার রেকর্ড ছিল এবং তিনি ডার্ক ওয়েবে ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, ফ্লাওয়ার্স গ্রেপ্তারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।
যুক্তরাজ্যে সাজা হলেও জুবায়েরের সামনে যুক্তরাষ্ট্রে বড় আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা চালিয়ে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগে মামলা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যে সাজা শেষ হওয়ার পর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা, যেখানে দক্ষ হ্যাকাররা দূরে বসেই একটি শহরের জনজীবন অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

















