জীবিকার তাগিদে বিদেশ পাড়ি জমানো অভিবাসীদের জন্য মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রগুলো এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে ২০২৪ সালে কঠোর অভিবাসন অভিযান শুরুর পর থেকে ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে অন্তত ১৪০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস এই পরিস্থিতির জন্য আটককেন্দ্রগুলোর অতিরিক্ত ভিড়, চিকিৎসায় অবহেলা এবং অমানবিক পরিবেশকে দায়ী করেছে। সংস্থাটি অবিলম্বে এসব মৃত্যুর স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফোর্টিফাই রাইটস জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির আটককেন্দ্রে মোট ৪৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৩ জন পুরুষ, ৬০ জন নারী এবং ১২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে সম্মিলিতভাবে ১০৯ জন মারা যান। এছাড়া চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও ৩১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৪ সালে অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০ জনে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রগুলোতে ২২ হাজার ৪৫ জন বন্দি রয়েছেন, যেখানে সরকারি ধারণক্ষমতা ২১ হাজার ৫৩০ জন। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ থাকায় কেন্দ্রগুলোতে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সেপসিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস ও মেনিনজাইটিসের মতো রোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফোর্টিফাই রাইটসের মতে, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের কারণে এসব রোগ ছড়ায় বা গুরুতর আকার ধারণ করে। যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, সেখানে অসুস্থ হলেও চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, এমনকি চিকিৎসা চাইলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। হোসেন নামের এক বাংলাদেশি সাবেক বন্দি জানান, অসুস্থতার কথা জানালে অনেককে মারধর করা হতো, যার ভয়ে বন্দিরা অসুস্থতা গোপন করতেন। রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের অন্যান্য শরণার্থীদের ভাষ্যমতে, জ্বর বা তীব্র ব্যথার মতো সমস্যায় পড়লেও তাদের কেবল প্যারাসিটামল দিয়ে বিদায় করা হতো। জ্যাক নামের এক সাবেক বন্দি জানান, তিনি নিজের চোখের সামনে এক থাই ও এক ইন্দোনেশীয় বন্দির মৃত্যু দেখেছেন, যাদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।
ফোর্টিফাই রাইটস জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী আটক প্রত্যেক ব্যক্তির পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘের ‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’ অনুযায়ী, বন্দিদের সাধারণ নাগরিকদের সমমানের স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

















