বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশে চলমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাসা-বাড়ির রান্নার কাজে এবং শিল্প-কারখানার উৎপাদনে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তার জন্য সরকার আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে এই সংকট সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি নয়, বরং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এটি হয়েছে। তবে সরকার তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে এবং তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে না পারলেও ২৪/৭ টিম কাজ করছে বলে জানান তিনি।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আশা প্রকাশ করেন যে আগামী সপ্তাহ থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। তিনি জানান, বর্তমানে মোট সরবরাহ যেখানে ৫০০-৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে আগামী সপ্তাহ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২৮০-৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে ৫০ শতাংশ সরবরাহ চালু করতে পারলে পরের সপ্তাহে তা ১০০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন যে আমদানিকৃত এলএনজি দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দিয়ে রি-গ্যাসিফাই করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউতে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
প্রাথমিকভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশা করা হলেও, ৪৮ ঘণ্টা পরও সমাধান না হওয়ায় আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এক্সিলারেট এনার্জির বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস এয়ার ফ্রেইটে আনা হচ্ছে এবং কাস্টমস ছাড়পত্র দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেরামত কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এফএসআরইউতে একটি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে, ওই সময় কাছাকাছি থাকা একটি এলএনজি কার্গো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এলএনজি দীর্ঘ সময় মজুত রাখা হয় না; জাহাজে আসা এলএনজি এফএসআরইউতে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল অচল থাকায় কার্গোর সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে, তবে সামিট পরিচালিত অন্য এফএসআরইউ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। স্বল্পমেয়াদে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস ব্যবহার এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। মধ্যমেয়াদে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় প্রয়োজন থাকলেও অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা গেলে সরবরাহ বাড়ানো যাবে। ভোলার স্থানীয় চাহিদা, শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সঙ্গে আলোচনা শেষে সবকিছু অনুকূলে থাকলে প্রায় এক বছরের মধ্যে সেই গ্যাস শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো এতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আগামী নভেম্বরে বিড জমা দেওয়ার শেষ সময়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

















