নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনির ৩৩টি শতবর্ষী গাছ কাটার অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকির যুক্তি দেখানো হলেও সরকারি নথিতে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। নথিতে গাছগুলোর পরিপক্বতা, আর্থিক মূল্য, ব্যবহারযোগ্যতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম দাবি করেছেন যে তিনি গাছগুলোকে ‘কর্তনযোগ্য’ বলেছেন, কাটার অনুমোদন দেননি।
নুরুল ইসলামের স্বাক্ষর করা নথিতেই গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণ, কর্তনযোগ্য ঘোষণা এবং কাটা গাছ পরিবহনের জন্য বনজদ্রব্য পরিবহন বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়ার পর সমালোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
গত ১১ জুন সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনির ৩৩টি গাছ কাটার অনুমোদন দিয়ে একটি নথিতে সই করেন। এর আগের দিন ১০ জুন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার সামাজিক বনায়ন, নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহিনুল ইসলাম মুজকুরি গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে প্রতিবেদন পাঠান। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নুরুল ইসলাম তার নথিতে লেখেন যে, মূল্যায়নকারী কর্মকর্তা গাছগুলোকে ‘পরিপক্বতা, আর্থিক/ব্যবহার উপযোগিতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় কর্তনযোগ্য’ বলে মত দিয়েছেন এবং তিনিও সেই মতের সঙ্গে একমত। একই চিঠিতে কাটা গাছ পরিবহনের জন্য বনজদ্রব্য পরিবহণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুসরণেরও অনুরোধ করা হয়।
তবে, নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসব গাছ পড়ে দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে, বাড়িঘরের ক্ষতি হচ্ছে। তাই এগুলোকে কর্তনযোগ্য বলেছি, কাটার অনুমোদন দিইনি।’ কিন্তু অনুমোদন না দিয়ে থাকলে গাছের মূল্য নির্ধারণ ও পরিবহনের বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশনা কেন দেওয়া হলো, সে প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
গাছ কাটার অনুমোদনের তালিকায় ৬ প্রজাতির ৩৩টি গাছ ছিল, যার বাজারমূল্য ধরা হয় ৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৯৬ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ৩টি রেইনট্রি, ৫টি কাঁঠাল, ২টি শেওড়া, ১টি নিম, ১২টি ইউক্যালিপটাস, ২টি মেহগনি, ৫টি আম, ১টি বট, ১টি কৃষ্ণচূড়া ও ১টি ডেওয়াগাছ। রংপুর সামাজিক বন বিভাগের তালিকায় এই ৩৩টি গাছের মধ্যে ৬টিকে জীবিত গাছ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সম্প্রতি সৈয়দপুর রেলওয়ে বাংলোর এই গাছগুলো পরিদর্শনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, যেসব গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ক্ষতিকর বলে মনে হয়নি। কয়েকটি মৃত গাছ অপসারণ করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শতবর্ষী গাছগুলোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিত।
১১ জুলাই প্রথম আলোয় এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। সৈয়দপুর রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বেশ কিছু গাছ মৃত এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে, যার প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি হেলে পড়া গাছ, একটি পড়ে যাওয়া গাছ ও তিনটি মৃত গাছের ছবিও পাঠান।
এর আগে তহিদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, জনস্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩টি গাছ কেটে ফেলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং গাছ কাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওই গাছগুলোর বদলে চলতি বর্ষায় পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বড় কারখানা গড়ে ওঠে সৈয়দপুরে। ওই কারখানার ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকার শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য গড়ে তোলা হয় সৈয়দপুর শহর। ওই সময়ের পরিকল্পিত সড়ক, ড্রেনেজব্যবস্থা ও সড়কবাতির পাশাপাশি প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছিল, যার অনেকগুলোই এখনো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দেশে প্রায় ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। সংস্থাটির ‘লগিং অব প্ল্যান্টস ইন বাংলাদেশ (২০২৪–২৫)’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত কাটা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার গাছ, যা আগের বছরে ছিল প্রায় সাড়ে ১১ লাখ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছালেহ আহমদ খান শতবর্ষী গাছ সংরক্ষণের চারটি প্রধান ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন: প্রধান ডালগুলোকে সংযুক্ত করে নড়াচড়া কমানো, কাণ্ড সুরক্ষিত করা, ওপরের অংশ ছাঁটাই করে ভারসাম্য আনা ও মৃত ডাল অপসারণ এবং ঝুঁকে পড়া ডালের নিচে শক্তিশালী খুঁটি বসানো। তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিকভাবে শতবর্ষী গাছ টিকিয়ে রাখতে হলে তার আশপাশের সহায়ক উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখা জরুরি, যা মাটির পুষ্টি বাড়ায়। ভারতের গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে রেইনট্রি প্রায় ১০০ বছর এবং বটগাছ ২৫০ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

















