প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন ও মালয়েশিয়া সফরের ঠিক এক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। বৃহস্পতিবার ঢাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই তার সফরটি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত জানতে চেয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিকের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশের পরবর্তী কৌশল কী হবে। অনেকে একে বাংলাদেশের ওপর একটি নতুন ধরনের কৌশলগত চাপ হিসেবেও দেখছেন।
সফরের প্রথম দিনেই সার্জিও গোর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতের মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একটি ইতিবাচক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সার্জিও গোর নিজেও তার এক্স হ্যান্ডেলে বৈঠকটিকে ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করে সম্পর্ক জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে সার্জিও গোর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেন। একই দিন তিনি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে একটি একান্ত বৈঠক করেন। এই বৈঠকটি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও এটি কোনো নিয়মভঙ্গ নয়, তবে বিষয়টি এমন ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার চেষ্টা করছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মন্তব্য করেন, এই বৈঠকটি যেন সেই পুরনো সমীকরণে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের চেয়ে পরাশক্তিগুলোর চাহিদাই বড় হয়ে দেখা দেয়।
সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। বিশেষ করে ওয়্যার হাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের অনুরোধ করেন তিনি। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানো হয়েছে এবং শিগগিরই তাদের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসবে বলে জানা গেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশাগুলো বাংলাদেশের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এর মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি, চীনের সঙ্গে আদান-প্রদান এবং ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কৌতূহল বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, বড় রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে চাপ আসা স্বাভাবিক, তবে তা সামাল দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সব মিলিয়ে এই সফর সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপথ ও ভবিষ্যতের কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

















