ইতিহাসের বই কিংবা আজকের দিনের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত রাজা, সম্রাট বা বিজয়ীদের নামই বড় করে দেখি। উন্নয়নের নামে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের গল্পে সরকারের কৃতিত্ব প্রচার করা হলেও, সেই প্রকল্পের পেছনে যাদের ভিটেমাটি হারিয়েছে, দোকান উচ্ছেদ হয়েছে কিংবা বস্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের কোনো স্থান নেই। জুলাইয়ের জনদ্রোহে এই মানুষগুলোই সম্মুখভাগে ছিলেন, কিন্তু আন্দোলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা যেন ইতিহাসের অতলে হারিয়ে গেছেন। তাদের ‘অবৈধ দখলদার’ বা ‘উন্নয়নবিরোধী’ তকমা দিয়ে উন্নয়নের বয়ান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদেরও একটি সাধারণ জীবন ছিল। তাদেরও ঘর ছিল, সন্তানদের স্কুল ছিল, বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ ছিল। হাসিনাশাসিত কথিত উন্নয়নের ভাষায় তাদের কষ্টকে কেবল ‘পুনর্বাসন সমস্যা’ বা ‘ক্ষতিপূরণ জটিলতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই যখন হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করল, তখন আবারও কৌশলে তাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। জুলাইয়ের ইতিহাস যদি মানুষের ভাষায় লিখতে হয়, তবে তা হবে ভিটেহারা ও নিরাপত্তাহারা মানুষের আর্তনাদ, যা পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের শক্তি ছিল মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে। কেউ মিছিলে স্লোগান দিয়েছেন, কেউ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়েছেন, কেউ গোপনে ওষুধ কিনে দিয়েছেন, আবার কেউ নিজের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় বিকল্প পথে তথ্য পৌঁছে দেওয়া বা রান্না করে খাওয়ানোর মতো মানবিক কাজগুলোই ছিল জুলাইয়ের প্রকৃত চালিকাশক্তি। বিশেষ করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মিছিলকারীদের উদ্দেশে ‘ভয় পেয়ো না, আমরা আছি’—এই বাক্যটিই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাহস।
ক্ষমতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও সন্দেহপ্রবণ করে তুলতে চায়, কিন্তু জুলাই মানুষকে একত্র করেছিল। মানুষ বুঝতে পেরেছিল, সম্মিলিতভাবে তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। জুলাইয়ের ইতিহাসকে এখন একটি ছোট গণ্ডিতে বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির বীরত্বগাথায় সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে, ঠিক যেভাবে অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলুষিত করা হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্য ও বহুত্বে, কিন্তু এখন সব শ্রেণির অংশগ্রহণকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
যে ইতিহাস গণমানুষের প্রতিরোধকে কেবল ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে পরিণত করে, সেই ইতিহাস প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যারা ব্যক্তিগত সুবিধা বা রাজনৈতিক হিসাব মেলানোর চেয়ে শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ, সেই বয়ান আমাদের কাম্য নয়। শাসকের পতন একটি সূচনা মাত্র, সমাপ্তি নয়। যদি পুরোনো রাষ্ট্রকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্নীতি, বিচারহীনতা এবং পুলিশি দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বজায় থাকে, তবে শুধু সরকার পরিবর্তন মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।
শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের প্রথম কাজ হলো সত্যকে রক্ষা করা। গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমঝোতা বা একচ্ছত্র বয়ানের কাছে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না। মানুষ নতুন কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দেয়নি; তারা জীবন দিয়েছে এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা তার অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না। জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রকে এটি মনে করিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম যে, মানুষ কেবল ভোটার বা করদাতা নয়, মানুষই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।

















