২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই আলোচিত ছয়টি রায়ে মোট ১৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চলমান বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল দুটি এ পর্যন্ত দেওয়া ছয়টি রায়ের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি অনেকাংশে পূরণ করেছে। তিনি এটিকে দৃষ্টান্তমূলক বলে উল্লেখ করেন, কারণ দেশের অন্য যেকোনো আদালতের চেয়ে অনেক কম সময়ে ছয়টি সংবেদনশীল মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এখনো অনেক মামলার বিচার দুটি ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেন যে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সকল বিচার নিশ্চিত হবে।
প্রথম রায়ে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলার একজন রাজসাক্ষী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। এই রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি শহীদদের পরিবারকে এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় রায়ে, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলেন— সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। এছাড়া, পলাতক আসামি সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড, শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড, এবং কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালালে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।
তৃতীয় রায়টি আসে লাশ পোড়ানোর মামলায়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আশুলিয়ায় ছয় জনের লাশ পোড়ানো ও অন্য একজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে আরো সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন— ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রনি ভূঁইয়া। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস ও সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। এছাড়া, সাত বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন— সাবেক এসআই আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসান। এই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
চতুর্থ রায়টি আসে আবু সাঈদ হত্যা মামলায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে এই মামলার অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া রায়ে সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল আসামি সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, এবং সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ (বেরোবি) এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবি’র সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ ও বেরোবি ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবি’র সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবি’র অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) রংপুরের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, বেরোবি’র সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলামকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, বেরোবি’র সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, বেরোবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, বেরোবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, বেরোবি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবি’র এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, বেরোবি’র সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া ও বেরোবি’র এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমুকে ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাস সময়কেই কারাবাস হিসেবে রায় দেওয়া হয়।
পঞ্চম রায়ে, কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং একই এলাকায় আরও দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন ও অপর আসামিকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ২৮ জুন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেওয়া রায়ে পলাতক চার আসামির মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় রামপুরা থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় গ্রেফতার একমাত্র আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ রায়ে, গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ৩০ জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে এই মামলার দুটি চার্জে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে আসামিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথনের মাধ্যমে কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি ও কুষ্টিয়ায় ছয় জনকে হত্যার ঘটনায় ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর চানখাঁরপুলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ২০২৫ সালের ২৬ মে আমলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুম-খুনসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখনো চলছে।

















