মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের নিরাপত্তার নতুন উপায় খুঁজতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। গত শুক্রবার মক্কা নগরীতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির লক্ষ্য যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। চুক্তি অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এটি দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি করবে।
যদিও এই চুক্তির বাস্তবিক রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগেরই প্রতিফলন। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসির মিডল ইস্ট ফেলো ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিচসেনের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান, যুদ্ধের পরবর্তী পরিচালনা এবং সংকট সমাধানে ঘন ঘন অবস্থান বদলানোর কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মার্কিন অংশীদারত্বের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং কৌশলগত ও নীতিগত বিকল্পের পরিধি বাড়ানো।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তোসি এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট একটি বড় ভূরাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, সৌদি আরব এখন ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদারত্বের পরিধি বিস্তৃত করছে। এদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ বাড়লেও ওয়াশিংটন তার মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করতে হিমশিম খেয়েছে, যার সিংহভাগই ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুকের মতে, এই চুক্তিকে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ভুল হবে। তিনি মনে করেন, এই দেশগুলো মূলত উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে এবং এই চুক্তির গুরুত্ব ‘আদর্শগত প্রতিরোধ’ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম পরিকল্পনাকারী ব্রেট ম্যাকগার্ক বিষয়টিকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন শুরুর অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা শেষে এই তিন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

















