চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড চরম আকার ধারণ করেছে। কথায় কথায় গুলি চালানো এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তারা নির্বিচারে অস্ত্র ব্যবহার করছে। সম্প্রতি চকবাজার থানার চন্দনপুরায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে পুলিশের পাহারা থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা গুলি চালিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। এই ঘটনা ২০১৭ সাল থেকে ওই এলাকায় শিক্ষকতা করা হাফেজ মো. রেজাউল কবিরকে হতবাক করেছে, যিনি এমন ঘটনা আগে কখনো দেখেননি।
স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ প্রথমে ১০ কোটি টাকা এবং পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারিও তাঁর বাসায় গুলি করা হয়। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বার্তা পাঠান সাজ্জাদ। এই ঘটনাগুলো নগরের বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, খুলশী, হাটহাজারী-সংলগ্ন এলাকা এবং পতেঙ্গা সৈকতের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানেও একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রামে সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মতো আটটি আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় আছে। এদের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, মোহাম্মদ রায়হান, শহীদুল ইসলাম (বুইস্যা বাহিনীর প্রধান), বার্মা সাইফুল এবং বাকলিয়া-কেন্দ্রিক মোরশেদ খান গ্রুপ ও আবদুস সোবহান-শওকত গ্রুপ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া মুরাদপুর-পাঁচলাইশ এলাকায় কিশোর গ্যাংও সক্রিয়। পুলিশের তালিকায় তিন শতাধিক সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে পর্যন্ত অন্তত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ জন খুন হয়েছেন চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩৫টি আলোচিত খুনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২২ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গুলি করার ঘটনায় অন্তত ১৩ জন শুটার বা হামলাকারী সংগঠকের নাম ঘুরেফিরে আসছে, যাদের মধ্যে মোহাম্মদ বোরহান, মেহেদী হাসান, খোরশেদ আলম, মোবারক ওরফে কালা মোবারক অন্যতম।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, সন্ত্রাসীদের কারণে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে রয়েছেন এবং তাদের কঠোর হাতে দমন করা উচিত। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম শহরে ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অক্সিজেন, বালুচরা, হামজারবাগ, চন্দনপুরা, চান্দগাঁও, বাদুরতলা, খুলশী, বার্মা কলোনি, বাকলিয়া, কালুরঘাট এলাকায় বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে ৬৮টি। ১৪ জুলাই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। এর আগের দিন বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ৩৫ লাখ টাকা লুট হয়। এর দুই দিন আগে সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। ডেভিড ইমন ২৯ জুলাই যশোরে গ্রেপ্তার হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বলছে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধজগৎ ও অস্ত্রের হাতবদল হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যারা পালিয়েছে, তাদের অস্ত্রগুলো এখনকার অনেক সন্ত্রাসীর হাতে চলে গেছে। মিয়ানমার সীমান্ত হয়েও অস্ত্রের চালান চট্টগ্রামে ঢুকছে। পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গেও চট্টগ্রামের অপরাধীদের যোগসাজশের তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
সিএমপির কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, অস্ত্রসহ বেশ কিছু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে, নগরের বাকলিয়ায় এক ব্যবসায়ীর বাসার দরজায় লাল রঙের দাগ এঁকে দিয়ে সন্ত্রাসীরা পাঁচ লাখ টাকা আদায় করেছে। ভয়ে তিনি কোনো মামলা করেননি।
চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আলোচিত নাম সাজ্জাদ আলী। ২০০০ সালে বহদ্দারহাটে আটজনকে গুলি করে হত্যার পর একে-чително রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ছাড়েন এবং বিদেশ থেকে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরের ৩৫টি গুলি ও খুনের ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৫টিতে সাজ্জাদ বাহিনী জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের হিসাবে বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার সক্রিয় আছেন।
সাজ্জাদের হয়ে দেশে তাঁর বাহিনী পরিচালনা করতেন ছোট সাজ্জাদ, যার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে বের হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং গত ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হন।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদের সহযোগীরা চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও খুনের ঘটনায় জড়িত। কিছু চক্র ফুটপাত, সড়ক, পরিবহনে চাঁদাবাজি করে। এদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ বছরও নানা কারণে ২০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিদেশে থাকা সন্ত্রাসী সাজ্জাদ নানা কৌশলে সদস্য নিয়োগ দিচ্ছেন। প্রচুর টাকা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ায় নিম্ন আয়ের ছিন্নমূল মানুষ ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা তাঁর দলে যোগ দিচ্ছে। নতুন সদস্যরা ধর্মগ্রন্থ ছুঁইয়ে আনুগত্যের শপথ নিচ্ছে। ১৩ মার্চ বড় সাজ্জাদের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করলে পুলিশ এ সম্পর্কে জানতে পারে।
সাইদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও ধারণ করে সাজ্জাদের কাছে পাঠাতেন। তাঁর কাজ ছিল কোন ভবন থেকে কত টাকা চাঁদা আদায় করা যাবে, সে তথ্য পাঠানো। এর বিনিময়ে তিনি প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন। পুলিশের ভাষ্যমতে, সাইদুলের মতো অর্ধশতাধিক সোর্স আছে সাজ্জাদের।
ফেসবুকও চট্টগ্রামে অপরাধজগতে অস্ত্রের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকাইয়া আকবর নামে পরিচিত আকবর আলী, যিনি বড় সাজ্জাদের দলে ছিলেন, পরে নিজে আলাদা বাহিনী গড়েন। আকবরকে হত্যার ঘটনায় মোহাম্মদ রায়হান নামের আরেক সন্ত্রাসীর নাম আসে। রায়হান রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় থাকেন এবং শহরে এসে ঘটনা ঘটিয়ে পাহাড়ি আস্তানায় চলে যান।
চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশের আতঙ্ক শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা আছে। বুইস্যার বাহিনী গ্যারেজ, ছোট ব্যবসা, মাদক, কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় চাঁদাবাজির ওপর নির্ভর করে। গত বছরের ৪ অক্টোবর বুইস্যার সহযোগী মুন্না পাঁচলাইশ বাদুরতলা এলাকায় গুলি ছোড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এই বাহিনী আলোচনায় আসে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কাজ করা র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, খুন ও গোলাগুলির অধিকাংশ ঘটনাই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। চাঁদাবাজি বা অবৈধ অর্থের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা ঘটছে। সন্ত্রাসের অন্যতম বড় কারণ মাদকের বিস্তার বলেও তিনি মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও দখল থেকেই সন্ত্রাসীদের অর্থের প্রবাহ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই চক্র ভাঙা কঠিন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো বেপরোয়া হয়ে যায়। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে অপরাধী হিসেবেই ধরতে হবে।
২০০৩ সালে ‘ক্রসফায়ারের’ ভয়ে এলাকা ছাড়া হন বাকলিয়া থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সন্ত্রাসী মোরশেদ খান।

















