বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর বাঁক হিসেবে চিহ্নিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক সংকট, বৈষম্য এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনকে অনেকে স্বতঃস্ফূর্ত বললেও, বাস্তবে এটি ছিল শক্তিশালী প্রভাব বলয়ের এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জাতির সামনে কিছু নির্মোহ সত্য উন্মোচিত হয়েছে, যা কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা মুক্তির আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংকটসংকুল।
এই পটপরিবর্তনের নেপথ্যে থাকা ভূ-রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তার এবং তরুণ সমাজকে টার্গেট অনুযায়ী ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী নকশা আজ স্পষ্ট। জুলাই কেবল জনরোষের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল এক বিশেষ মেটিকুলাস ডিজাইনের আড়ালে প্রভাবশালী বলয়ের শক্তি প্রদর্শন। দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দিতে এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী মহল পর্দার অন্তরালে থেকে এই চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে। এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার গৌণ হয়ে ক্ষমতার মসনদ দখলের আধিপত্যই মুখ্য হয়ে ওঠে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় তরুণ সমাজকে অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের মনে পরিবর্তন, উচ্চাভিলাষ এবং রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার অন্ধ আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে আবেগতাড়িত করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার নেতিবাচক পরিণতি আজ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে চেপেছে। বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহারের চাদর সরে যাওয়ার পর, নতুন বন্দোবস্তের নামেও পুরোনো সিন্ডিকেট ও লুটপাটের চিত্রই উদ্ভাসিত হয়েছে।
আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সুশাসনের লেবাসে সুযোগসন্ধানীদের আখের গোছানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসার পরিবর্তে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিবর্তনের নামে জীবন আরও জটিল হওয়ায় সমাজের বড় একটি অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন—”আগেই তো ভালো ছিলাম।” এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়, বরং বর্তমান অব্যবস্থাপনা থেকে জন্ম নেওয়া এক বাস্তবসম্মত হাহাকার।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব সংহত করেছে। দেশের কৌশলগত অবস্থানকে পুঁজি করে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন চেপে বসছে। অথচ সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন বা সাম্য প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিলেও, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংকট দূর করার কোনো লক্ষণ নেই।
এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। জাতিকে বাঁচানোর জন্য অন্ধ আবেগ ও হুজুগে রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মননশীল ও বাস্তবমুখী চিন্তার চর্চা প্রয়োজন। তরুণ সমাজকে যেন কেউ আর ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের হাতিয়ার বানাতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। একই সাথে সব ধরণের সিন্ডিকেট, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তথাকথিত মেটিকুলাস ডিজাইন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আশার আলো এই যে, সাধারণ মানুষ ও সচেতন তরুণ প্রজন্মের প্রগতিশীল অংশ এতদিনে বুঝতে শিখেছে কার কি উদ্দেশ্য। এই সচেতনতাই আগামীর শক্তি। পরিশেষে, বিদেশি শক্তি বা অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত যেন জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলতে না পারে, সে জন্য দেশপ্রেমিক সকল দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। পারস্পরিক অনাস্থা ও বিভাজনের দেয়াল ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শোষণহীন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

















