দেশে বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধির পরও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। জ্বালানি স্বল্পতা, বিশেষ করে গ্যাসের সংকট এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন না বাড়ানোই লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে, যা গ্রামের মানুষকে বেশি ভোগান্তিতে ফেলছে.
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে বিদ্যুতের দাম ১২ বার পাইকারি ও ১৪ বার খুচরা পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া বাবদ বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর সরকারের ভর্তুকি বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর গরম বাড়লেই লোডশেডিং দেখা দেয়, যা ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থায়ী হয়। বৃষ্টি নামলে চাহিদা কমলে কিছুটা স্বস্তি মেলে.
পিডিবির দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুফল পেতে দুই মাস সময় লাগে, যা এখনো পিডিবির হিসাবে আসেনি। তবে দাম বাড়ার পর পিডিবির বকেয়া আর বাড়বে না এবং পুরোনো বকেয়া ধাপে ধাপে শোধ করা হবে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও, গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। এর ফলে অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অব্যবহৃত রাখতে হচ্ছে। গ্যাস থেকে উৎপাদন ৪ হাজার মেগাওয়াটের কম হচ্ছে এবং গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে খরচ আরও বেড়ে যাবে, তাই সেগুলো কম চালানো হচ্ছে। রাতের বেলায় লোডশেডিং সহনীয় রাখতে উৎপাদন বাড়ানো হলেও মধ্যরাতের পর তা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে.
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পিডিবির অনলাইন বৈঠকে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কয়লাচালিত কেন্দ্রে তাৎক্ষণিক উৎপাদন বেশি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হওয়ায় ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছিল, যা সম্প্রতি আবার চালু হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রটির ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা বকেয়া থাকায় আগামী মাস থেকে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রও ঝড়-বৃষ্টিতে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। তবে, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। বৈঠক সূত্র বলছে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র গতকাল সন্ধ্যায় ৮০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছিল।
ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ চাহিদায় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু ঢাকার বাইরের চারটি বিতরণ সংস্থার ভাষ্যমতে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। বিশেষ করে আরইবি, যারা সারা দেশে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তারা বড় ধরনের ঘাটতির শিকার। ফেনী জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪০ মেগাওয়াট হলেও গড়ে প্রতিদিন ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। ফলে ফেনীর স্টারলাইন ফুড প্রোডাক্ট প্রাইভেট লিমিটেডের মতো কারখানাগুলোর উৎপাদনে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, এখানে পল্লী বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। বৈঠক সূত্র বলছে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র গতকাল সন্ধ্যায় ৮০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছিল।
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বাঘবেড় গ্রামের বাসিন্দা আক্কাস আলী আকন্দ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট সরবরাহ হওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। হবিগঞ্জের কোথাও কোথাও প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, যা চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে প্রক্রিয়াজাত পাতা নষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। জিনজিরা বাসরোড এলাকার গৃহবধূ রোকেয়া বেগম বলেন, দিনে বিদ্যুৎ থাকেই না, গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে। রাতে ঘুমানোর সুযোগও হচ্ছে না। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ (সদর দপ্তর) মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। নীলফামারীর ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় গ্রাহকরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, যা গরমের মধ্যে কাজ করা কঠিন করে তুলেছে।
গতকাল সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
এর আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।

















