রাজধানীর তীব্র যানজট নিরসন এবং বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকার চারপাশের ১১০ কিলোমিটার নৌপথে বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাস চালুর বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই সার্কুলার নৌপথটি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ্বরী নদীকে ঘিরে বিস্তৃত। বর্তমানে এই পথে যাত্রী ও পর্যটনসেবা চালুর জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরির কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত ১ জুলাই অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিদ্যমান সার্কুলার নৌপথে এক মাসের মধ্যে বৈদ্যুতিক ওয়াটার বাস চালুর লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী দানী জানান, প্রস্তাবিত সেবাটি কীভাবে কার্যকর ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। যেহেতু বৈদ্যুতিক বা সৌরবিদ্যুৎচালিত নৌযানের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ইউটিলিটি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত, তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। প্রস্তাবিত ১১০ কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ৬৩ কিলোমিটারের গভীরতা ১২ ফুট এবং বাকি ৪৭ কিলোমিটারের গভীরতা প্রায় ৮ ফুট।
এর আগে ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট বাদামতলী-গাবতলী রুটে এবং ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী রুটে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। তবে নানাবিধ সমস্যার কারণে প্রথম রুটটি ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এবং দ্বিতীয় রুটটি ২০২০ সালের মার্চে বন্ধ হয়ে যায়। বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, ১২টি ওয়াটার বাস তৈরিতে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও আয় হয়েছিল মাত্র ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। মোট ৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল। সড়কপথে দ্রুত যাতায়াত, বুড়িগঙ্গার দূষণ, সদরঘাটের যানজট, দুর্বল ল্যান্ডিং সংযোগ এবং বালুবাহী নৌযানের কারণে কাঙ্ক্ষিত গতি না পাওয়াই এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল।
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, আগের উদ্যোগের সমস্যাগুলো সমাধান না করে নতুন করে ওয়াটার বাস চালু করলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। এজন্য নির্ভরযোগ্য ফিডার সার্ভিস, ব্যস্ত সময়ে পর্যাপ্ত নৌযান, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, বড় প্রকল্পের চেয়ে নিয়মিত ড্রেজিং, নদীর বাঁক সোজা করা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএর জরিপ অনুযায়ী ঢাকার নদীগুলোতে তরল বর্জ্য ফেলার ৪২৪টি উৎস শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৪৪টি বেসরকারি কারখানা। বর্জ্য অপসারণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকে এই প্রকল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নৌপথ পুনরুজ্জীবনে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ৯ ও ১৪ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গাবতলী-সদরঘাট রুটে বাণিজ্যিক গণপরিবহন পরিচালনায় আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উচ্চগতির লঞ্চ, স্পিডবোট, ক্যাটামারান ও পর্যটন নৌযান চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে সার্কুলার নৌপথের ২০ কিলোমিটার এলাকায় ওয়াকওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং আরও ৫২ কিলোমিটারের কাজ শেষের পথে। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ৮৩৫ একর নদীতীরের জমি উদ্ধার করা হয়েছে।

















