ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের তালিকায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ওয়েইন রুনি, রোনালদো নাজারিও, দিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা পেলের নাম উঠে আসে। তাদের প্রত্যেকেই বল নিয়ন্ত্রণ, ফিনিশিং, গতি বা শারীরিক সামর্থ্যে অনন্য ছিলেন, তবে সবার খেলার মধ্যেই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড যেন সেই প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায়ের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে, হালান্ড কি সাধারণ মানুষ, নাকি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি কোনো ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড’ অ্যাথলেট?
৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই ফরোয়ার্ডের বিস্ফোরক গতি এবং গোল করার যান্ত্রিক দক্ষতা তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। কেবল জন্মগত প্রতিভা নয়, বরং নিজের শরীরকে বৈজ্ঞানিকভাবে গড়ে তোলার কারণেই তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম হোলার তথ্য অনুযায়ী, হালান্ড প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ক্যালরি গ্রহণ করেন, যার মধ্যে গরুর হৃদপিণ্ড ও কলিজার মতো অঙ্গের মাংসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব থাকে। নিজের প্রামাণ্যচিত্র ‘Haaland: The Big Decision’-এ তিনি জানিয়েছেন, নিজের শরীরের যত্নের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন।
হালান্ড সাধারণ পানির পরিবর্তে বিশেষভাবে পরিশোধিত পানি পান করেন। এছাড়া পালং শাক, কাঁচা দুধ ও কেলের মিশ্রণে তৈরি একটি পানীয় তিনি নিয়মিত পান করেন, যা তিনি মজার ছলে ‘ম্যাজিক পোশন’ বলে অভিহিত করেন। পারফরম্যান্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তিনি ঘুমকে দেখেন এবং প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন। এমনকি দুপুরেও তিনি নিয়মিত বিশ্রাম নেন। মেন্স হেলথের তথ্যমতে, কৃত্রিম আলোর প্রভাব কমাতে ঘুমানোর তিন ঘণ্টা আগে তিনি কমলা রঙের বিশেষ চশমা পরেন এবং নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে মুখে বিশেষ টেপ ব্যবহার করেন। ঘুমের সময় তিনি সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখেন।
তার অনুশীলনের মূলে রয়েছে শক্তি, গতি ও নমনীয়তা। রেড বুল সালসবুর্গের সাবেক কোচ স্ট্যানিস্লাভ ম্যাসেক জানান, কৈশোরেই হালান্ড প্রতিদিন ৩০০টি পুশ-আপ ও এক হাজার সিট-আপ করতেন, যার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢালে স্প্রিন্ট ও যোগব্যায়াম ছিল তার রুটিনের অংশ। মানসিক দিক থেকেও তিনি বেশ স্পষ্টবাদী। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোল নিয়ে তিনি বলেছিলেন, শারীরিক ক্লান্তির কারণে তিনি অতিরিক্ত সময় খেলতে চাননি, তাই দ্রুত গোল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
মাঠের শেষ দিকে তার চুলের বাঁধন খুলে দেওয়ার দৃশ্যটি বেশ পরিচিত। তার লম্বা চুলের শক্তির উৎস নিয়ে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের একটি পরামর্শের কথা তিনি জেমস কর্ডেনের শোতে জানিয়েছিলেন। জ্লাতান তাকে বলেছিলেন, চুল না কাটতে, কারণ শক্তির বড় অংশ চুলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই হালান্ড নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, কঠোর অনুশীলন এবং উন্নত ক্রীড়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ে আধুনিক ফুটবলের এক আদর্শ অ্যাথলেটে পরিণত হয়েছেন।
টেলিভিশন অনুষ্ঠান জেমস কর্ডেনের স্পেশাল শো ‘After with James Corden’-এ হালান্ড জানান, সুইডিশ কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ একবার তাকে বলেছিলেন, ‘কখনো চুল কাটবে না। শক্তি লুকিয়ে আছে চুলেই।’

















