আমাদের প্রাত্যহিক নাগরিক আড্ডায় প্রায়ই একটি উদ্বেগজনক বাক্য শোনা যায়—‘বাঙালিকে ঠিক রাখতে একজন কড়া শাসকের একনায়কত্বই দরকার’ অথবা ‘অনির্বাচিত কোনো শক্তি ক্ষমতায় থাকলে দেশ নিয়মের মধ্যে চলে’। এই আক্ষেপ কেবল চায়ের দোকানের আলাপ নয়; অতীতের জনমত জরিপেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক লুটপাট ও সংঘাতের মুখে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ তথাকথিত সেনাসমর্থিত বা নির্দলীয় ব্যবস্থার সাময়িক শান্তির প্রতি আস্থা খুঁজে পায়। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ লড়াই আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে নাগরিকের মনে কেন এই আত্মঘাতী মোহ তৈরি হয়? মানুষ কি সত্যিই একনায়কত্ব চায়, নাকি তাদের চাওয়া একটি নিরাপদ জীবন ও সুশাসন?
আমাদের জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটানো আর টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মৌলিক পার্থক্য বুঝতে না পারা। একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতন ঘটানো হয়তো মুহূর্তের বীরত্বপূর্ণ ঘটনা, কিন্তু কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ প্রতিদিনের প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের মনে নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হলেও, পুরনো দলগুলোর প্রত্যাবর্তন ও নির্বাচনমুখী মেরুকরণ সেই চিরচেনা প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
গণতন্ত্রকে আমরা প্রায়ই জাদুকরী ভেন্ডিং মেশিন মনে করি, যেখানে ভোট দিলেই রাতারাতি সুশাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সেবাদান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র ও ‘রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা’ ভিন্ন বিষয়। একটি অগণতান্ত্রিক সরকার দ্রুত মেগা প্রজেক্ট বা নাগরিক সুবিধা দিতে সক্ষম হলেও, ক্ষমতার জবাবদিহিতা না থাকলে সেই সক্ষমতাই সাধারণ মানুষের জন্য নরক হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র আমাদের স্বর্গীয় সরকারের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে স্বেচ্ছাচারী শাসককে বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা থেকে সরানোর নিয়মতান্ত্রিক পথ উন্মুক্ত রাখে।
তরুণ সমাজের মানসিকতায় আজ একটি গভীর প্যারাডক্স তৈরি হয়েছে। জরিপে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রচলিত নোংরা রাজনীতিকে ঘৃণা করলেও প্রায় ৮০ শতাংশই ভোটাধিকার প্রয়োগে উদগ্রীব। তারা এমন রাজনীতির স্বপ্ন দেখে যেখানে মেধা ও সততা অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু ক্ষমতার হাতবদলের পরও যখন পুরনো নোংরা অভ্যাসগুলো ফিরে আসে, তখন তরুণদের মনে অনীহা তৈরি হয়। এছাড়া, আমাদের দেশে গণতন্ত্রকে দেখা হয় দলগত আধিপত্যের সংকীর্ণ চশমা দিয়ে, যেখানে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার প্রতিহিংসামূলক মানসিকতা ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অর্থ হলো প্রতিপক্ষের মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা এবং তাকে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দিয়ে ধ্বংস না করা।
বিচার নিশ্চিত করা আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এক জিনিস নয়। বিগত দিনের গুম, খুন ও দুর্নীতির বিচার হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে, কোনো মবের হাতে নয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতাও বড় সংকট। যে দল নিজের সংগঠনের ভেতর গোপন ব্যালট বা দ্বিমত সহ্য করে না, তারা ক্ষমতায় গিয়ে উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ উপহার দেবে—এমন আশা করা আত্মপ্রবঞ্চনা। এছাড়া, আমাদের সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ রাজনৈতিক মেরুকরণে দলীয় দাসে পরিণত হওয়ায় সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিব্ল্যাট তাঁদের ‘হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের মৃত্যু সাধারণত সামরিক অভ্যুত্থানে হয় না, বরং নির্বাচিত নেতাদের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমেই ঘটে। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসন যদি সরকারের প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে কোনো রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রই জনগণের ভাগ্য বদলাতে পারবে না। গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়; এটি একটি নিরন্তর সংগ্রাম, যার মূল শক্তি হলো পরমতসহিষ্ণুতা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নাগরিকের সার্বক্ষণিক অতন্দ্র পাহারা।

















