জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হওয়া ছেলে শাহরিয়ার হোসেনের মৃত্যুর জন্য আওয়ামী লীগসহ মোট ২৮ জনকে দায়ী করেছেন তাঁর বাবা।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তিনি ভারত পালিয়ে যান। এর আগে ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালে তিনি দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি এবং পরবর্তীতে এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য এবং রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার পর শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি ছয় বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ড থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯৮১ সালের ১৭ মে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি তিনটি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নব্বইয়ের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের সংসদীয় নির্বাচনেও তিনি বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠিত করেন। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি বিরোধী দলের নেতা ছিলেন।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি কারাবন্দী হন এবং ১১ জুন মুক্তি পান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭ এবং ১৯৮৯ সালে বিভিন্ন সময়ে সামরিক সরকার তাঁকে আটক বা গৃহবন্দী করে রেখেছিল। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাঁকে লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়। এই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তাঁর দলের ২২ নেতা-কর্মী নিহত হন এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পেয়েছিলেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান সম্মাননা ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করেছে। ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানে অবদানের জন্য ইউনেসকো তাঁকে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৯ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট তাঁকে ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কারে ভূষিত করে। তিনি ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভার্সিটি পুরস্কার এবং দুবার সাউথ সাউথ পুরস্কারও লাভ করেন। ২০১৪ সালে ইউনেসকো তাঁকে ‘শান্তির বৃক্ষ’ এবং ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম তাঁকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে তাঁকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করে। টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) তাঁকে ICTs in Sustainable Development Award-2015 প্রদান করে।
শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘ওরা টোকাই কেন?’, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, ‘দারিদ্র্য বিমোচন, কিছু ভাবনা’, ‘আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম’, ‘আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘সাদা কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, ‘Miles to Go, The Quest for Vision-2021’ সহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা। প্রযুক্তি, রান্না, সংগীত এবং বই পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। তাঁর স্বামী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে ইন্তেকাল করেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ একজন তথ্য প্রযুক্তিবিদ এবং তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। মেয়ে সায়মা হোসেন ওয়াজেদ একজন মনোবিজ্ঞানী এবং তিনি অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে কাজ করেন। শেখ হাসিনার সাতজন নাতি-নাতনি রয়েছে।

















