দিল্লির লালগালিচা প্রস্তুত ছিল, কিন্তু ঢাকা থেকে আসা একটি স্পষ্ট ও আপসহীন বার্তা সাউথ ব্লকের হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা আপাতত ঝুলে গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগে পলাতক শেখ হাসিনা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ঘাতকদের ফেরত দিতে হবে, তারপরই সফরের আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে। এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী দিল্লির মাটিতে পা রাখবেন না বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এখনই দেশটিতে সফরে না যাওয়ার এই দৃঢ়োচিত সিদ্ধান্তকে কূটনীতির মাঠে বাংলাদেশের ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সাউথ ব্লকের কথায় তাৎক্ষণিক সাড়া না দিয়ে বরং কিছুটা সময় নেওয়ায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়ছে। যদিও ভারতীয় গণমাধ্যম এবং দেশটির কূটনৈতিক মহল তারেক রহমানের দ্রুত ভারত সফরের ওপর জোর দিচ্ছে এবং না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তবুও বর্তমান সরকার তার পররাষ্ট্রনীতিতে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে তা প্রশংসিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণের পর থেকে ৬ ও ৭ নম্বর পয়েন্টে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে এই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও দুই দেশের মধ্যে সফরের তারিখ নিয়ে আলোচনা চললেও অনিশ্চয়তা কাটছে না।
গত ১৬ আগস্ট রাতে ঢাকার বারিধারায় আয়ারল্যান্ডের অনারারি কনসাল মাসুদ জামিল খান ও তার স্ত্রী কেট জারো খানের আয়োজিত এক নৈশভোজে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্পর্কের ‘সোনালি সময়’ তৈরির কথা বললেও, সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বাংলাদেশের এই অবস্থানকে ‘রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রত্যর্পণ একটি আইনি প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফর যুক্ত করা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত।
তবে সরকারের এই কঠোর অবস্থানের প্রশংসা করছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। সাবেক প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেনের মতে, ভারত সরকার যেভাবে তারেক রহমানকে সফরে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা সন্দেহের উদ্রেক করে। তিনি বলেন, অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী সফর করবেন, কিন্তু ভারত কেন এতো তাড়াহুড়ো করছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অন্যদিকে, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম ও কাফি কামালের মতো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় এই দৃঢ়তা জরুরি। তারা মনে করেন, ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

















