জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান পানিসংকট মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি ভারত এখন তার প্রাচীন জলব্যবস্থার দিকে পুনরায় মনোযোগ দিচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে পরিত্যক্ত কুয়া, জলাধার, মাটির বাঁধ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রাচীন কাঠামো সংস্কার করে সেগুলো ব্যবহারের আওতায় আনা হচ্ছে। রাজস্থানের আলওয়ার শহরের মুসি রানি সাগর স্টেপওয়েল এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০২১ সালে সংস্কার শুরুর পর ২০২৫ সালে তিন দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো এই জলাধারটি পানিতে ভরে ওঠে। ১৮০০-এর দশকের শুরুর দিকে নির্মিত ১ দশমিক ৩ একর আয়তনের এই জলাধারটি দীর্ঘদিন দূষিত ও অকার্যকর ছিল, যা বর্তমানে প্রায় ৩০ ফুট পানি ধারণ করছে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাওরি, জোহাদ, কুন্ড, টাঙ্কা ও নাদি নামে পরিচিত এই প্রাচীন ব্যবস্থাগুলো বৃষ্টির পানি ধীরগতিতে মাটিতে প্রবেশ করিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণে সহায়তা করে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ ভারতে বসবাস করলেও দেশটির মিঠা পানির উৎস বিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ, যার একটি বড় অংশ দূষিত। কৃষি ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে ভারত বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণতা বাড়ায় মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং তীব্র বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে যাওয়ার আগেই দ্রুত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমিয়ে দিচ্ছে। আধুনিক বাঁধ বা খালের তুলনায় স্টেপওয়েল ও জোহাদের মতো কাঠামো পানিকে সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষিত রেখে ভূগর্ভস্থ জলাধার রিচার্জে বেশি কার্যকর।
আলওয়ারে জোহাদ বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির মাটির বাঁধের পুনরুজ্জীবন দারুণ ফল দিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে নদী শুকিয়ে ‘ডার্ক জোন’ ঘোষিত এই অঞ্চলে ১৯৮৫ সালে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক রাজেন্দ্র সিং স্থানীয়দের সহায়তায় জোহাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯৮৬ সালে গোপালপুরা গ্রামের জোহাদ পানিতে পূর্ণ হওয়ার পর আশপাশের শুকিয়ে যাওয়া কূপগুলোতেও পানি ফিরে আসে। ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি জলসংরক্ষণ কাঠামো নির্মাণের ফলে পাঁচটি নদী সারা বছর সচল হয় এবং প্রায় ২৫০টি গ্রাম উপকৃত হয়। এছাড়া মারাঠওয়াড়ায় ৬ হাজারের বেশি গ্রাম জলসংরক্ষণ কাঠামো নির্মাণ করে ৫৫০ বিলিয়ন লিটারের বেশি পানি ধরে রাখার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
স্বাধীনতার পর বড় বাঁধ ও খালের ওপর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিপরীতে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণে ঘাটতি ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকারের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে সরকার প্রতিটি বাড়িতে বিশুদ্ধ পানির সংযোগের পাশাপাশি জোহাদ, টাঙ্কা ও কুন্ড পুনরুজ্জীবনে গুরুত্ব দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পানি সংরক্ষণ কাঠামো থেকে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ২০১৭ সালের ১৪ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৫ বিলিয়ন ঘনমিটারে পৌঁছেছে। এছাড়া ২০২০ সালে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যানে ১ কোটি ৪০ লাখ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কাঠামো তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিয়মিত পলি অপসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এই উদ্যোগের দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। রাজস্থানের ৬৭ বছর বয়সী বাসিন্দা বর্ষার মতে, জোহাদ নির্মাণের ফলে এখন সারা বছর তাদের গ্রামের কূপে পানি থাকে, যা আগে সম্ভব ছিল না।
ভারতের অন্যান্য অঞ্চলও ঐতিহ্যবাহী জলব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের সুফল পাচ্ছে। পশ্চিম ভারতের মারাঠওয়াড়ায় ২০১০-এর দশকের শেষ দিকে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজারের বেশি গ্রাম নিজেদের মাটি ও পানি সংরক্ষণ কাঠামো নির্মাণ বা সংস্কার করে। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৫৫০ বিলিয়ন লিটারের বেশি পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে এর সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি সংস্থা পানি ফাউন্ডেশন।
২০২০ সালে ভারত সরকার কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের একটি মাস্টারপ্ল্যানও গ্রহণ করে। এতে বৃষ্টির পানি ও বৃষ্টির প্রবাহকে মাটির নিচে পাঠিয়ে ক্ষয়িষ্ণু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনাটিতে ১ কোটি ৪০ লাখ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ভরণ কাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ১৮৫ বিলিয়ন ঘনমিটার বর্ষার পানি ধারণ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

















