দেশে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ফলে দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামে এক নির্মম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ক্রমাগত রেকর্ড গড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি না বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনে তীব্র অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও বৈচিত্র্য ধরে রাখা এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। সর্বশেষ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি যখন ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, তখন মজুরি বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। কাগজে-কলমে মানুষের আয় সামান্য বাড়লেও বাস্তবে তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে।
দেশের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আতাউর, মকবুল কিংবা সাইদুলের মতো কোটি কোটি শ্রমিকের কোনো নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো, কর্মঘণ্টা বা শ্রম আইনের কার্যকর সুরক্ষা নেই। বাজারে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজির দাম প্রতিনিয়ত বাড়লেও তাদের আয় বাড়ানোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই। ফলে বাজারদরের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে তারা চরম হিমশিম খাচ্ছেন।
জীবনযাত্রার খরচ সামাল দিতে মানুষ প্রথমে বিনোদন, পোশাক ও সঞ্চয় কমিয়ে দেয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে মানুষ খাবারের পাতেই কাটছাঁট করছে। মাছ, মাংস, দুধ ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে শুধু পেট ভরানোর জন্য ভাত বা সাধারণ খাদ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। একই সাথে বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দেশের মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণোপযোগী মজুরি কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের বাস্তব খরচ বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। তাই মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে পুষ্টি, মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হোক অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য।

















