ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভিলেজের সামনের অ্যাপ্রোন এলাকাটি গত ১১ বছর ধরে ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের দখলে রয়েছে। একসময় আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রতীক হয়ে ওঠা এসব বিমান এখন মরিচা ধরা অকেজো স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে। এই ১২টি উড়োজাহাজ বিমানবন্দরের প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল করে রাখায় নিয়মিত ও অনিয়মিত উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং রপ্তানি পণ্য ওঠানামায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পর কার্গো ও লজিস্টিক সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য জায়গাটি দ্রুত খালি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, চারটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের মালিকানাধীন এই ১২টি উড়োজাহাজের বিপরীতে পার্কিং ফি ও চক্রবৃদ্ধি হারে সারচার্জসহ মোট পাওনা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জিএমজি এয়ারলাইন্সের কাছেই পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের কাছে পাওনা রয়েছে। বাজেয়াপ্তকৃত ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইন্সের একটি এবং অ্যাভিয়েন চ্যার্টারের একটি বিমান রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব বিমানের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে এবং বারবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিমান সরিয়ে নেয়নি।
জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালে এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ২০২০ সালের মার্চ মাসে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিগুলোর কর্ণধাররা প্রভাব খাটিয়ে বিমানবন্দরের এই অপারেশনাল এলাকা দখল করে রেখেছেন, যার ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে জায়গা খালি করতে ২০২১ সালের শেষ দিকে এবং ২০২২ সালজুড়ে নিলামের চেষ্টা চালানো হলেও উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় এসব বিমানের ইঞ্জিন, অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম ও ককপিটের যন্ত্রপাতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এগুলো পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। উড়োজাহাজগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো মডেলের—ড্যাশ-৮, এমডি-৮৩ ও বোয়িং ৭৩৭-৩০০।
গত ১৬ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বেবিচক জানিয়েছে, ক্রেতা না পাওয়া গেলে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ওজনভিত্তিক হিসেবে বিমানগুলো বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, উড়োজাহাজগুলো এখন কার্যত স্ক্র্যাপে পরিণত হয়েছে এবং এগুলো দ্রুত সরানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুলো সরানো প্রয়োজন যাতে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অপারেশন নিশ্চিত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বিমান বিক্রি নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

















