লোকসানে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোতে দেওয়া ঋণের বোঝা এখন সোনালী ব্যাংকের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি এসব প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে আদায় করতে পারছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই সংকট নিরসনে ব্যাংকটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে হস্তক্ষেপ চেয়েছে এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের ওপর চাপ কমাতে বকেয়া ঋণের বিপরীতে সরকারি বন্ড ইস্যু অথবা নতুন করে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট অর্থ বিভাগের সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান উল্লেখ করেন যে, অনাদায়ী এসব ঋণের বিপরীতে উচ্চ হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এতে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি যেমন বাড়বে, তেমনি মুনাফার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জানা যায়, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এবং এর অধীন ৯টি চিনিকলকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৩,১০৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল সোনালী ব্যাংক। এর মধ্যে বিএসএফআইসির অনুকূলে বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে বর্তমানে ব্যাংকের মূল পাওনা ২,৭৬২ কোটি টাকা। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় সুদ ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে মোট পাওনা ৭,১৯২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর থেকে ২৫৩ কোটি টাকা আদায়ের পর বর্তমানে নিট বকেয়া রয়েছে ৬,৯৩৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিএসএফআইসির ঋণের বিপরীতে ১,০০০ কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টি ছিল, যার মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। এর আগে এই ঋণের বিপরীতে ৬টি সরকারি গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ানো হলেও বর্তমানে সবগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় এসব ঋণ এতদিন অশ্রেণিকৃত ছিল, তবে সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকে এগুলো খেলাপি হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঋণখেলাপি হওয়া ঠেকাতে সোনালী ব্যাংক গত ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত একাধিকবার অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। সর্বশেষ ১৯ আগস্ট পাঠানো চিঠিতেও জরুরি ভিত্তিতে সরকারি গ্যারান্টি বা বন্ড ইস্যুর দাবি জানানো হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির (অ্যালকো) সভাতেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনেও একক ঋণগ্রহীতার নির্ধারিত সীমা অতিক্রমকারী ঋণগুলো সমন্বয়ের জন্য ব্যাংকটিকে চাপ দেওয়া হয়েছে।
বিএসএফআইসির অধীন ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টি ২০২০ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে চালু থাকা ৯টি চিনিকলের অধিকাংশেরই লোকসানের কারণ হিসেবে উৎপাদন মূল্য ও সরকার নির্ধারিত মূল্যের মধ্যকার পার্থক্যকে দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। বিএসএফআইসির দাবি, ভর্তুকি ও ট্রেড গ্যাপ বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের কাছে তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮,০৪১ কোটি টাকা। তবে এ বিষয়ে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান সুরুজের কাছে জানতে চাওয়া হলে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

















