শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা বেআইনি বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে গভর্নিং বডির সভাপতির কেবল টেলিফোনিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা আইনবহির্ভূত। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদন খারিজ করে গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত রোববার প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর, যখন গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছোট মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর অধ্যক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করায় গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামানের টেলিফোনিক নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।
পরবর্তীতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটি ২০ এপ্রিলের সভায় এই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নামঞ্জুর করে শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গভর্নিং বডির সভাপতি আখতারুজ্জামান হাইকোর্টে রিট করলে আদালত চূড়ান্ত শুনানির পর রুল ও স্থগিতাদেশ উভয়ই খারিজ করে দেয়।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, বেসরকারি কলেজের শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে লিখিত নোটিসের মাধ্যমে ব্যাখ্যার জন্য কমপক্ষে সাত দিন সময় দিতে হবে এবং ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ থাকতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন প্রয়োজন, কোনো ব্যক্তির মৌখিক বা টেলিফোনিক নির্দেশ এর বিকল্প হতে পারে না। এছাড়া মামলার নথিতে ঘটনার তারিখ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সংকুচিত করায় প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালত মন্তব্য করেছে।
রায়ে বলা হয়েছে, গভর্নিং বডি কেবল বরখাস্তের প্রস্তাব দিতে পারে, সরাসরি বরখাস্ত করতে পারে না। বরখাস্ত কার্যকরের আগেই বোর্ডের অনুমোদন আবশ্যক, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা রাবার স্ট্যাম্প নয়। আদালত গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিলের বোর্ডের সিদ্ধান্তকে যথাযথ ও আইনসম্মত বলে ঘোষণা করেছে। তবে শিক্ষক আবুল মনসুর বর্তমানে অবসরের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই। তবুও অবসরের বয়স পর্যন্ত তাঁর বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে আদালত রায় দিয়েছে। মামলায় রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী কামরুজ্জামান ও শিক্ষকের পক্ষে জহিরুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না শুনানি করেন।
জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় নোটিস দেওয়া হয় এবং ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হলে ২০ এপ্রিলের সভায় তা নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়।

















