প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ ১ সেপ্টেম্বর দলটি তাদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। অথচ ক্ষমতায় ফেরার এই ছয় মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব তৈরি হয়—রাষ্ট্র পরিচালনা ও দলীয় সংগঠন সচল রাখা। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা মন্ত্রিসভার সদস্য এবং মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বড় অংশ সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও দায়িত্ব পেয়েছেন দলের অনেকে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দলীয় কর্মকাণ্ডে।
দুই দশক ধরে বিএনপি মূলত আন্দোলন-সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। এখন সেই জায়গা নিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক তৎপরতা আগের তুলনায় কমেছে বলে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা জানিয়েছেন। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে বড় কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা এখন তেমন চোখে পড়ছে না। এর ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে যোগ হয়েছে মাঠপর্যায়ের রাজনীতির চরিত্রের পরিবর্তন। দীর্ঘ সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা নেতা-কর্মীদের একাংশের মধ্যে এখন দলীয় পদ, সরকারি সুবিধা কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সমর্থন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক বলয়। ঢাকায় এসে নেতাদের সাথে দেখা করে প্রভাব জানান দেওয়া এবং স্থানীয় নির্বাচনে সমর্থন নিশ্চিত করাই অনেকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও বঞ্চনার ক্ষোভও মিশেছে।
তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলনের সময় নিষ্ক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের সরকার ও প্রশাসনে জায়গা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এর পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস, দখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও উঠছে। গত ২৭ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, সংশোধন না হলে আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে কারো মুখ দেখা হবে না। দলীয় নেতাদের আশঙ্কা, এসব প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একনিষ্ঠ নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকার গঠনের পর থেকেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিরোধী দলগুলো সরব। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব সংকটকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফল হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, সরকার এই সংকট সমাধানে দিনরাত কাজ করছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব পদ ছাড়ার পর রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার সদস্য যুক্ত করা হয়েছে, যা সরকার ও সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করবে বলে নেতারা মনে করছেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির জন্য বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। অনেক জায়গায় একই পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। এই টানাপোড়েন সামলাতে তারেক রহমান বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, ক্ষমতায় থেকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা বিএনপির জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এবং দায়িত্ব বেড়েছে। তিনি মনে করেন, সরকারের সামনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই বিএনপিকে জনগণের কাছে গিয়ে সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। মানুষকে বিষয়টি বোঝাতে পারলে তারা নিশ্চয়ই তা মেনে নেবে। সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে জেলা ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠন এবং নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনার উদ্যোগও নিয়েছে দলটি।

















