প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। তিনি বলেন, ‘চলতি দশকে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে চায় সরকার। বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার এসেছে এবং বাংলাদেশের একটি নতুন দিকনির্দেশনা রয়েছে।’
আজ বৃহস্পতিবার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। চুক্তির অধীনে ইআরএল-এর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন করবে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তার সরকারের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র এবং এ অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে পরিণত করা। তিনি উল্লেখ করেন, ‘পোশাকশিল্প আমাদের প্রথম প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। এখন আমরা চাই ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং সবুজ শিল্প পরবর্তী প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করবে। আমরা এমন কারখানা চাই, যেগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং এমন কর্মসংস্থান চাই, যা মানুষের মর্যাদা তৈরি করবে।’
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের কথাও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং হেলথ কার্ড প্রবর্তনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো দেশ একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। এখন অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও আইএসডিবি’র মধ্যে নতুন ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই সহযোগিতা আরও উদ্ভাবনী, সাড়াপ্রদানকারী ও ফলভিত্তিক হবে এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে আইএসডিবি ও এর সহযোগী সংস্থাগুলোর ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি সদস্যদেশগুলো ও মুসলিম উম্মাহর জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে যে আপনার দ্বিতীয় মেয়াদ আরও বড় সাফল্য বয়ে আনবে। আমাদের সরকার আপনার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।’
অর্থায়ন চুক্তিটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে তারেক রহমান বলেন, এটি শুধু একটি লেনদেন নয়; বাংলাদেশের প্রতি ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের আস্থারও বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং আমরা এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হতে পেরে গর্বিত। এই সদস্যপদ আমাদের জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। এটি শুধু অর্থায়নের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইসলামি উম্মাহর সদস্য হিসেবে আস্থা, সংহতি এবং অভিন্ন লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্বল্প খরচে অর্থায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে ইসলামিক কনসেশনাল ফান্ড (আইসিএফ) প্রতিষ্ঠায় ড. আল জাসেরের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আইসিএফ থেকে সুবিধা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে তহবিলটি সদস্য দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন সহায়তা আরও বাড়াবে।
সম্ভাব্য প্রকল্প চিহ্নিত করতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঢাকায় আইএসডিবির আঞ্চলিক হাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আইএসডিবি’র বৃহত্তর ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকটি সদস্য দেশগুলোর নিজ নিজ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘কিছু সদস্য রাষ্ট্র জ্বালানি খাতে এগিয়ে আছে। অন্যরা অবকাঠামো খাতে। ব্যাংকটি তাদের মধ্যে সেতুবন্ধন হতে পারে- সদস্যরা যেন শুধু পাশাপাশি নয়, বরং একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে।’
বাংলাদেশ সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালীকরণে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ড. আল জাসেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আপনার উপস্থিতি আমাদের মধ্যকার বন্ধনের দৃঢ়তারই পরিচায়ক। এই উপলক্ষ্যটি অংশীদারত্ব, সংহতি, উদ্ভাবন এবং যৌথ সমৃদ্ধির প্রতি আমাদের যৌথ অঙ্গীকারকে নবায়ন করুক।’ তিনি বলেন, ‘আজকের এই চুক্তি স্বাক্ষর প্রমাণ করে যে অংশীদারত্ব কী করতে পারে। এটি যৌথ লক্ষ্যকে বাস্তব ফলে পরিণত করে। পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পটি শুধু একটি জ্বালানি বিনিয়োগ নয়। এটি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সক্ষমতায় একটি বিনিয়োগ।’
বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে ‘বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগারের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের জন্য ১,০০৪.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
প্রকল্পটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বিপিসির বর্তমান পরিশোধন ক্ষমতা ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হবে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে, পরিবেশবান্ধব (ইউরো-৫ মানসম্পন্ন) পেট্রোলিয়াম তেল উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে।
আইএসডিবি বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অংশীদার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনুদান, প্রকল্প ঋণ, বাণিজ্য অর্থায়ন, বেসরকারি খাতে অর্থায়ন, রপ্তানি ঋণ নিশ্চয়তা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যাংকটি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিরন্তর সহায়তা দিয়ে আসছে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরপরই আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলোতে সহায়তা করার বিষয়ে তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

















