শুধুমাত্র উচ্চ শুল্ক ও কৃত্রিম প্রশাসনিক বিধিনিষেধ দিয়ে দেশীয় শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা বা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টেকসই করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ শিল্পের সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন এবং ব্যবসা পরিচালনার সার্বিক পরিবেশ সহজ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। মঙ্গলবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি এক সন্ধিক্ষণে: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এই সেমিনারে দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন পিআরআই-এর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার।
এফবিসিসিআই প্রশাসক বলেন, শুল্ক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই, কিন্তু শুধু শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনই বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থায়নের চড়া ব্যয় এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা। গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে কেবল শুল্ক পুনর্বিন্যাস করলে শিল্পখাত কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না।
সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মো. ফজলুল হক। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে তুলা সুতা আমদানি সীমিত করে এনবিআর যে কাস্টমস এসআরও জারি করেছে, সে বিষয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র ভাষ্যমতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অংশীজনদের সাথে সমন্বয়ের দাবি জানান।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. নোরা ডিহেল। তিনি জানান, অতিরিক্ত প্যারা-ট্যারিফ দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচ প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য-ভারযুক্ত গড় এমএফএন শুল্ক ৭ শতাংশ হলেও, নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক যুক্ত হওয়ার পর তা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি মধ্যবর্তী পণ্যে শুল্ক কমানো ও ধাপে ধাপে প্যারা-ট্যারিফ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, গত ২৫ বছরে জমে থাকা সংস্কারের বড় এজেন্ডাগুলো এখন বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি ২০২৯ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক বিলোপ করে সর্বোচ্চ কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। পিআরআই-এর পলিসি ফেলো ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সব ধরনের কাস্টমস ডিউটি বিলোপ করলে দেশের বড় কোনো বিপর্যয় হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অপচয় কমবে। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এতে হয়তো সাময়িকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক রাজস্ব হারাতে হতে পারে, কিন্তু ৪০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অর্থনীতিতে এই ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে গিয়ে যে ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক অপচয় হয়, তার ক্ষতি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সমান।’ সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদও কর্মশালায় নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সমাপনী বক্তব্যে পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম বলেন, শিক্ষা, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা পরিচালনায় সার্বিক সহজীকরণ ছাড়া শুল্ক সংস্কারের পূর্ণ সুফল অর্জন সম্ভব নয়।

















