প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশ এক ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশটিতে আর্জেন্টিনা থেকে ১০ হাজার মাইল দূরে থেকেও দলটির প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা যেন সীমানাহীন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাদ, সড়ক ও আবাসিক ভবনে শোভা পায় আকাশি-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও হাজারো দর্শকের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার উৎসবমুখর আয়োজন চলে।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। ক্রীড়া সাংবাদিক শামীম চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও শিরোপা জয়ের মাধ্যমে। এছাড়া ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস থাকায়, সেই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার হাতে ইংল্যান্ডের পরাজয়টি তৎকালীন মানুষের কাছে প্রতীকী তাৎপর্য বহন করেছিল। শামীম চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকান ফুটবলারদের ড্রিবলিং শৈলী বাংলাদেশিরা দারুণ পছন্দ করে, যে ধারায় লিওনেল মেসিও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২২ সালে মেসি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর এই আবেগ যেন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ভক্তদের এই আবেগ প্রকাশের ধরনও বেশ বৈচিত্র্যময়। ঢাকার ২১ বছর বয়সী ছাত্র নাফিজ মাহমুদ আলিফ ও তার বন্ধুরা গত দুটি বিশ্বকাপে ২০০ ফুট লম্বা একটি আর্জেন্টিনার পতাকা তৈরি করেছিল, কিন্তু সেটি দেশের অন্যান্য বড় পতাকার ভিড়ে আলাদাভাবে চোখে পড়েনি বলে তিনি জানান। তাই এ বছর তারা ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেছেন। তারা এক মাস ধরে পরিশ্রম করে ৪০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি তৈরি করেছেন। দুটি দশতলা ভবনের মাঝখানে এই জার্সি উত্তোলনের পর তা হাজার হাজার ভক্তের পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতেরও নজর কাড়ে, যিনি প্রতিনিধিদল নিয়ে এটি দেখতে এসেছিলেন। বাংলাদেশে এমন বিশাল সমর্থক গোষ্ঠীর কারণেই ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা পুনরায় ঢাকায় তাদের দূতাবাস চালু করে।
অনেক ভক্তের কাছে এই ভালোবাসা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। ৪৪ বছর বয়সী মঈনুদ্দীন দেওয়ান জানান, শৈশব থেকেই আর্জেন্টিনা তার আবেগের জায়গা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর নিজের গ্রামে প্রায় ৫০০ মানুষের বিজয় মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সে রাতে সারারাত ধরে উদযাপন হয়েছিল। একই রকম আবেগের কথা জানান ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিবরিয়া রাফি। তিনি বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে এনজো ফার্নান্দেজের গোল করার পর আবেগ এতটাই তীব্র ছিল যে, ভিডিও ধারণের কথাও তার মনে ছিল না।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান। আর্জেন্টিনার ম্যাচে গোল খাওয়ার সময় ব্রাজিল সমর্থকদের বিদ্রূপ অনেক সময় উত্তেজনার সৃষ্টি করে, যা মাঠের বাইরের এই ফুটবল উন্মাদনাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২০: ২৭আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২০: ৪৪
প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই ক্রিকেটপ্রেমী বাংলাদেশ যেন বদলে যায় এক ফুটবলপাগল দেশে। রাজধানী ঢাকার ছাদ, সড়ক, দোকানপাট ও আবাসিক ভবনে উড়তে থাকে আকাশি-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসানো হয় বিশাল পর্দা, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার অনুষ্ঠান। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন না করলেও, আর্জেন্টিনার থেকে ১০,০০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই জাতির অনেকেই দলটিকে নিজেদের দল হিসেবে সমর্থন করেন।

















