দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাওয়া বাংলাদেশ দলের জন্য ডারউইন ও ম্যাকে মাঠ প্রস্তুতকারকদের কাজ বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রচণ্ড আর্দ্রতা, অস্বাভাবিক ঘাসের বৃদ্ধি এবং সরীসৃপের উপস্থিতি সত্ত্বেও তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন.
ডারউইনের মারারা ওভাল এবং ম্যাকে-এর হারাপ পার্ক—এই দুটি মাঠই অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী গ্রীষ্মকালীন সূচির বাইরে প্রায় দুই দশক পর প্রথমবারের মতো টেস্ট ক্রিকেট আয়োজন করতে যাচ্ছে। ডারউইনের জন্য এটি বিশেষ এক প্রত্যাবর্তন, যেখানে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটের ঐতিহ্যও তুলে ধরা হবে। অন্যদিকে, ম্যাকে-এর হারাপ পার্ক উচ্চপর্যায়ের ক্রিকেটের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়ার মাত্র দ্বাদশ পুরুষ টেস্ট আয়োজনকারী মাঠে পরিণত হবে।
ডারউইনের মাঠ পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা জেক প্যাভলিশের কাজের পরিধি বেশ বিস্তৃত। তিনি শুধু মারারা ওভালেরই নন, প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দূরের অ্যালিস স্প্রিংসের ট্রেগার পার্কের উইকেটও তত্ত্বাবধান করেন। অ্যাডিলেডের শান্ত আবহাওয়ার তুলনায় ডারউইনের আবহাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বর্ষাকাল এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম। প্যাভলিশ জানান, মারারা ওভালের ঘাস কখনোই বেড়ে ওঠা থামায় না এবং বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। ঘাসের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সবসময় পরিকল্পনা করতে হয়, তবে অতিরিক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করতে চান না তিনি, কারণ এতে উইকেটের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডারউইনে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে গড়ে যত বৃষ্টি হয়, অ্যাডিলেডে পুরো এক বছরেও তার অর্ধেকের মতো বৃষ্টি হয়। এই কারণে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চল যখন শীতের ঠান্ডায় কাঁপে, তখন ডারউইনে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক শীতকালজুড়ে ক্রিকেট আয়োজন করা হয়। বর্ষার আগে প্রচণ্ড আর্দ্রতার সময় স্থানীয়ভাবে ‘আমের উন্মাদনা’ নামে পরিচিত অস্বস্তিকর আবহাওয়া মাঠকর্মীদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
স্থানীয়ভাবে এই সময়ের এক ধরনের অস্বস্তিকে ‘আমের উন্মাদনা’ বলা হয়।তবে প্যাভলিশ সহজে বিচলিত হওয়ার মানুষ নন।২০২৪ সালে উত্তরাঞ্চলে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল স্টেডিয়ামের মাঝখানে একটি স্থানান্তরযোগ্য উইকেট বসানো। এই উইকেটটি দুই টুকরো করে আলাদা জায়গায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে মাঠে এনে জোড়া লাগানো হয়। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ আয়োজনের সময় ডারউইনই প্রথম অস্ট্রেলীয় মাঠ হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। যদিও প্যাভলিশ স্বীকার করেন যে উইকেটকে দুই ভাগ করা আদর্শ পদ্ধতি নয়, তবে তিনি ও তার দল এমনভাবে দেখভাল করেন যাতে দর্শকের চোখে কোনো পার্থক্য ধরা না পড়ে।
ম্যাকে-এর মাঠ প্রস্তুতকারক পিটার কাজাকফেরও রয়েছে অসাধারণ অভিজ্ঞতা। ব্রিসবেন স্টেট হাইস্কুলের ছাত্র থাকাকালীন তিনি কিংবদন্তি মাঠ প্রস্তুতকারক কেভিন মিচেলের অধীনে কাজ শুরু করেন। মিচেলের কাছ থেকে তিনি হাতে-কলমে কাজ শেখা এবং চাপের মধ্যে নিজেকে সামলানোর কৌশল আয়ত্ত করেন। কাজাকফ প্রায় দুই দশক ধরে গাব্বার উইকেট তৈরির অভিজ্ঞতার পর ম্যাকে-তে আসেন, যেখানে তার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
১৯৩১ সালের এপ্রিলে উত্তর কুইন্সল্যান্ড সফরে ডন ব্র্যাডম্যান যখন কংক্রিটের উইকেটে শতক করেন, তখন প্রায় ৬ হাজার দর্শক মাঠে এসেছিলেন। ম্যাকে-তে জমি কেনার সময় সেখানে কেবল গরুর চারণভূমি ছিল। শহরের ক্রিকেটের আগ্রহের কারণে জায়গাটি দ্রুত মাঠে রূপান্তরিত হয়। হারাপ পার্ক ১৯৯২ সালে এক দিনের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেলেও বর্ষাকালের শেষদিকে ভারত-শ্রীলঙ্কার ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়। এরপর আড়াই কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার ব্যয়ে মাঠটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়, যা এটিকে উচ্চপর্যায়ের ক্রিকেটের কেন্দ্র হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কাজাকফ বলেন, তাদের এমন একজন মাঠ প্রস্তুতকারক দরকার ছিল যার ওই পর্যায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
হারাপ পার্ককে ২০৩২ সালের অলিম্পিক গেমসের ক্রিকেট আয়োজনের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। কাজাকফ বলেন, এটি একসময় স্থানীয় পর্যায়ের ক্রিকেট মাঠ ছিল, যা এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের টেস্ট ভেন্যুতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।২০২১ সালে নারী দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের পর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এখানে অস্ট্রেলিয়া এ দল, শেফিল্ড শিল্ড এবং এক দিনের কাপের ম্যাচ হয়েছে।
ডারউইন ও ম্যাকে তুলনামূলক শীতল ও শুষ্ক মৌসুমে টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করা হলেও এতে নতুন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। মধ্য কুইন্সল্যান্ডে শীতকালে তাপমাত্রা কখনো কখনো এক অঙ্কে নেমে যায়, যা ঘাসের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। ডারউইনে শুষ্ক মৌসুমে লবণপানির কুমিরের আক্রমণ কমে গেলেও, প্যাভলিশকে মাটির তাপমাত্রা ধরে রাখতে বিশেষ জালজাতীয় আবরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ঘাসের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
দুই মাঠ প্রস্তুতকারকই জানেন, উচ্চপর্যায়ের সাদা বলের ক্রিকেটের জন্য ভালো উইকেট তৈরি করা এবং পাঁচ দিন ধরে মানসম্মত টেস্ট ম্যাচ চালানোর উপযোগী উইকেট তৈরি করা ভিন্ন বিষয়। অভিজ্ঞতম মাঠ প্রস্তুতকারকরাও ভুল করতে পারেন, যেমন গত গ্রীষ্মের বক্সিং ডে অ্যাশেজে মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠের উইকেট। প্যাভলিশ ও কাজাকফ স্বীকার করেন যে কিছুটা চাপ আছে, তবে তারা চান এই উপেক্ষিত অংশে টেস্ট ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন সফল হোক।
বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজটি ১৩ থেকে ১৭ আগস্ট ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে এবং ২২ থেকে ২৬ আগস্ট ম্যাকে-এর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত হবে।
তার আগে সেখানে অস্ট্রেলিয়া টানা ১৬ টেস্টে অপরাজিত ছিল।কাজাকফ বলেন, 'আমি প্রায় নিখুঁত রেকর্ড নিয়েই বিদায় নিতে পারতাম।'তবে দুই দশকের কাছাকাছি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত গাব্বার উইকেট তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নেওয়াটা মোটেও খারাপ সমাপ্তি ছিল না।ব্রিসবেন থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার উত্তরে ম্যাকে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সামনে ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ।১৯৩৯ সালে ম্যাকে সাউথের জুলিয়েট স্ট্রিটের জমি কেনার সময় সেখানে ছিল কেবল গরুর চারণভূমি।

















