ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ‘সন্তান দত্তক’ দেওয়ার নামে চলছে শিশু কেনাবেচার রমরমা বাণিজ্য। ‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম’—এমন বিজ্ঞাপন এখন ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে হরহামেশাই চোখে পড়ে। ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালানো অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকে এ ধরনের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যার কোনো কোনোটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এসব গ্রুপে রীতিমতো দর-কষাকষি করে শিশু কেনাবেচার আলাপ চলছে, যা আইন ও সরকারের নজরদারির বাইরে। তিনি লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না। এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% (১০০) রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’ ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেয়েশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর চাহিদা ও দাম বেশি। একটি চক্র বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খুঁজে বের করে এবং প্রসব পর্যন্ত তাদের দেখাশোনা করে। ছেলে নবজাতকের দাম তিন লাখ এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন গ্রুপে গর্ভকালীন ডাক্তারি রিপোর্ট কেনাবেচা, শুক্রাণু দান বা সারোগেসির আড়ালে যৌনসেবা প্রদানের প্রস্তাবও পাওয়া গেছে। আমরা এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি (২৮৮ট) পোস্ট খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছি।
প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাচ্চা পাওয়ার আশায় তারা প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম জানান, এক নবজাতকের জন্য অগ্রিম ১০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর পর সেই গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলো ব্লক করে দেওয়া হয়। এভাবে অনেক নিঃসন্তান দম্পতি সর্বস্ব হারাচ্ছেন। অনুসন্ধানে এমনও দেখা গেছে, পারিবারিক সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে নিজের সন্তানকে বিক্রির চেষ্টা করছেন অনেকে।
ফেসবুকের বাইরেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এই অনৈতিক ব্যবসা। যাত্রাবাড়ীর ‘আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কনসালটেন্সি ফি বা ব্যবস্থাপনা খরচের নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কোম্পানিটি দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা দলিল তৈরি করে বাচ্চা হস্তান্তরে সহায়তা করে, তবে এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ দাবি করেন, দত্তক নেওয়ার চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় তারা এই সমন্বয়কারীর কাজ করছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ দত্তক আইন নেই। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে শিশুকে বেচাকেনা বা হস্তান্তর দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় অপরাধ। ২০২৬ (২০২৬) সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনেও একে শোষণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা মনে করেন, এ ধরনের কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা তাদের কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে নজরদারি জরুরি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, ফেসবুকে এ ধরনের কার্যক্রম অপরাধমূলক হলেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ২০১৩ (২০১৩) সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ আছে। বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে একটি সর্বজনীন দত্তক আইন প্রণয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

















