মাদ্রাসায় হেফজ শেষ না করেই রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন ওহিদুল মোল্লা। তবে সেই পেশায় বেশিদিন টেকেননি। জীবিকার তাগিদে তিনি রিকশা চালানো শুরু করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে ওহিদুলের নেতৃত্বে একটি হ্যাকার চক্র গড়ে ওঠে এবং এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। এই কয়েক বছরে তিনি বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়ার পাশাপাশি মহিষ ও কবুতরের খামারও গড়ে তোলেন।
ওহিদুল মোল্লার এই উত্থানের গল্প তাঁরই চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা বর্ণনা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ওহিদুল তাঁর গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে নিজের বাড়ি পর্যন্ত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। গত সোমবার দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তিনি লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের প্রয়াত রব্বেল মোল্লার ছেলে। তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে।
ওহিদুলের চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা, যিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে ওঠাবসা করেন, তিনি জানান, ওহিদুলের বাবা কৃষিকাজ করতেন। বাবার জীবদ্দশায় ওহিদুল গ্রামের মাদ্রাসায় পড়তেন। বাবার মৃত্যুর পর হেফজ শেষ না করেই তিনি রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ শুরু করেন। এরপর রিকশা চালানো শুরু করেন এবং এই সময়ে এলাকার হ্যাকারদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ বছর আগে রিকশা ছেড়ে দিয়ে হ্যাকিং শুরু করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই তিনি দক্ষ হ্যাকার হয়ে ওঠেন। তাঁর সম্পদ দ্রুত বাড়তে থাকে। মোহরকয়ায় বাবার বাড়ি থাকলেও তিনি বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীর ধারে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর খামারে লাখ টাকা দামের কবুতর ও মহিষ রয়েছে।
গ্রেপ্তার এড়াতে পুলিশের ওপর নজরদারির জন্য গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত মোট ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন ওহিদুল। তিনি কবুতরের ঘরের আড়ালে নিজের থাকার জন্য দামি আসবাবপত্র ব্যবহার করতেন। সেই কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও সিসিটিভি মনিটরও ছিল। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তাঁর উঁচু ইটের প্রাচীরবেষ্টিত বাড়িতে ঢোকার একটি মাত্র ফটক থাকায় স্থানীয় লোকজন তেমন যাতায়াত করতেন না। তবে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে তরুণদের আনাগোনা ছিল সেখানে। নাম প্রকাশ না করে ওহিদুলের এক প্রতিবেশী জানান, বাড়ির চারপাশে এত সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে ওহিদুল বলতেন, কবুতরচোর ঠেকানোর জন্য ক্যামেরা লাগিয়েছেন।
হ্যাকিং ও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে ওহিদুল অল্প সময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তিনি দামি গাড়ি নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালপুরে ভাড়ায় চালিত একটি প্রাইভেট কারের চালক জানান, ওহিদুল গাড়ি ভাড়া নিয়ে পাবনা ও রাজশাহীতে যেতেন এবং কখনো কখনো সারা রাত গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি কেনাকাটার সময় দরদাম করতেন না এবং খাবারের হোটেলের কর্মচারীদের হাজার হাজার টাকা বকশিশ দিতেন। ভাড়ার বাইরেও তাঁদের ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বকশিশ দিতেন তিনি।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, ওহিদুল মোল্লা এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর কাছে শিখে অনেকেই এই কার্যক্রমে জড়িয়েছেন। গ্রেপ্তারের সময় ওহিদুলের কাছ থেকে ৬৮টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা হ্যাকিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। ওসি আরও বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পুলিশ অন্যদের বার্তা দিতে চায় যে, লুকিয়ে থাকার কৌশল অবলম্বন করেও কেউ পার পাবে না।

















