বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি ফিল্মের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে ভারত। খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের মোড়ক তৈরিতে ব্যবহৃত এই পণ্যটির বিষয়ে ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিদপ্তর (ডিজিটিআর) এই উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১৩ জুলাই পাঠানো এক চিঠিতে ডিজিটিআর আগামী ৬ আগস্ট ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে একটি মৌখিক শুনানির কথা জানিয়েছে। এই শুনানিতে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন ও থাইল্যান্ড থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পিইটি ফিল্মের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভারতীয় উৎপাদকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে ডাম্পিং মূল্যে পিইটি ফিল্ম ভারতে রপ্তানি করা হচ্ছে, যা স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি করছে। তাই এই পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছেন তারা। মূলত কোনো দেশ যখন মনে করে বিদেশি প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের নিজস্ব শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন তারা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অতিরিক্ত এই আমদানি শুল্ক আরোপ করে থাকে।
তদন্তের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই শুনানিতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারক, ভারতীয় উৎপাদক, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেডের পাশাপাশি নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং ভারতের আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান চিরিপাল পলি ফিল্মস লিমিটেড, ইস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ভ্যাকমেট ইন্ডিয়া লিমিটেডকে এই প্রক্রিয়ায় পক্ষ করা হয়েছে। অংশ নিতে আগ্রহী পক্ষগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয় জমা দিতে বলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিইটি ফিল্ম বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যগুলোর একটি এবং ভারত এর অন্যতম বড় বাজার। কোম্পানিটির দাবি, বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি ফিল্ম রপ্তানি করা হয় এবং বাকি উৎপাদন দেশের বাজারে বিক্রি হয়। তবে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শুনানির পর প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ পর্যালোচনার ভিত্তিতে ডিজিটিআর পরবর্তী সুপারিশ করবে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে এবং ভারত সরকারের কাছে শুল্ক আরোপ না করার অনুরোধ জানানো হবে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেড বর্তমানে দেশের একমাত্র বড় পিইটি ফিল্ম উৎপাদক। যাত্রার সময় প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৪২ হাজার টনের বেশি উৎপাদন সক্ষমতার কথা জানিয়েছিল। যোগাযোগ করলে আকিজ বায়াক্স ফিল্মস লিমিটেডের অন্যতম কর্ণধার শেখ বশিরউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের রপ্তানি বাজারভিত্তিক এবং কোনো ডাম্পিং হয়নি। শুনানিতে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওরিয়ন মার্কেট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে পিইটি ফিল্মের আকার প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের ওপর ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বহাল রয়েছে। এছাড়া হাইড্রোজেন পারক্সাইডের ওপরও ভারত একই ব্যবস্থা কার্যকর রেখেছে। অতীতে রহিমআফরোজের ব্যাটারি, ফ্লোট গ্লাস ও ফিশিং নেটের বিরুদ্ধেও ভারত তদন্ত করেছিল, যার মধ্যে রহিমআফরোজের ব্যাটারি নিয়ে ডব্লিউটিওর কাছে যাওয়ার পর আলোচনা পর্যায়ের ৬০ দিনের মধ্যেই ভারত অভিযোগ তুলে নিয়েছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের উচিত ডব্লিউটিওর কাঠামোয় জোরালো আলোচনার মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার উদাহরণ তৈরি করা।
এটি আকিজ বশির গ্রুপের একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, যা ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে।
শুনানিতে তাঁরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।ভারতভিত্তিক বেসরকারি বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওরিয়ন মার্কেট রিসার্চের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক পিইটি ফিল্মের বাজারের আকার এখন প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

















