বাংলাদেশ

জন্মসনদে নামের ভুলে ভোগান্তি, নাগরিকেরা দিশেহারা

প্রতিবেদক
সব খবর

জন্মনিবন্ধন সনদে নামের অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক ভুল নিয়ে নাগরিকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কানিজ ফাতেমার ১১ বছর বয়সী ছেলের জন্মসনদে তার নাম লেখা হয়েছে ‘ক্‌জ্‌ক্‌ল্‌জ্‌’ এবং স্বামীর নাম ‘লক্‌জ্‌ক্‌’। এমন ভুলের কারণে তার ছেলেকে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য জন্মসনদ জমা দিতে সমস্যা হচ্ছে। এই ধরনের ভুলের শিকার হয়েছেন আরও অনেক নাগরিক, যাদের নামের জায়গায় ‘দতককা’, ‘LJKLJF’, ‘ইউওইউও’ বা শুধু ‘০’ ও ‘–’ দেখা যাচ্ছে।

গত রবিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে (মিরপুর–১০) গিয়ে দেখা যায়, নামবিভ্রাটের কারণে সংশোধনের জন্য এসেছেন বেশ কয়েকজন। মিজানুর রহমান নামের একজন এসেছিলেন আরেকজনের জন্মসনদ সংশোধনের জন্য, যেখানে মায়ের নাম শাহানার জায়গায় লেখা ছিল ‘দতককা’। নাছির আহম্মেদ বেলাল নামের একজন জানান, তার বড় মেয়ের ইংরেজি নামে ভুল এসেছে এবং তার ও তার স্ত্রীর নামের জায়গায় এসেছে ‘LJKLJF’। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই ভুলগুলো তারা করেননি, বরং নিবন্ধন কার্যালয় থেকেই হয়েছে।

৬ অক্টোবর মঙ্গলবার জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস পালিত হয়েছে, যার এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। তবে এই প্রতিপাদ্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নাগরিকেরা তাদের ভুলের দায় কেন নিতে হচ্ছে এবং কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলছেন।

রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের (জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে জন্মনিবন্ধন হয়েছে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি। এই সময়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে জন্মনিবন্ধন সংশোধিত হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ। মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি এবং সংশোধন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। গত বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধন হয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার।

নাম-ঠিকানার ভুল সংশোধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা। সেই হিসাবে এ বছরের আট মাসে নাগরিকেরা সংশোধন বাবদ ফি দিয়েছেন সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। গত বছর নাম–ঠিকানার ভুল সংশোধনে ভুক্তভোগীরা দিয়েছেন ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। তবে নাছির আহম্মেদের মতো যাঁরা কম্পিউটারের দোকান থেকে সংশোধনের আবেদন করেন, তাঁদের অতিরিক্ত খরচ হয়। তিনি দুই মেয়ের জন্মসনদ সংশোধনের আবেদন করতে দোকানের কর্মীকে ৩০০ টাকা দিয়েছেন।

নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের ভুলের শুরু সাধারণত বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে যেকোনো একটি ভাষায় সনদ চেয়ে আবেদন করা থেকে। তিন বছর আগে একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি সনদ দেওয়ার কোনো উদ্যোগ ছিল না। কেউ শুধু ইংরেজি সনদ চাইলে, আবেদনপত্রে শুধু ইংরেজি ঘর পূরণ করা হতো এবং বাংলা ঘরে যেকোনো কিছু টাইপ করে দেওয়া হতো। ফলে ইংরেজি সনদ ঠিকঠাক এলেও বাংলা সনদে নাম–ঠিকানা ভুল আসত। একই ভুল হয়েছে যাঁরা শুধু বাংলা সনদ নিয়েছেন, তাঁদের ইংরেজি নামের ক্ষেত্রে।

বর্তমানে জন্মসনদ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একসঙ্গে এক পাতায় থাকে। ফলে যেকোনো একটি ভাষায় ভুল হওয়া মানে পুরো জন্মসনদই ভুল, যা সংশোধন ছাড়া ব্যবহার উপযোগী নয়। রাজধানী ঢাকার মতো সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকায় সংশোধনের জন্য চারটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে অনলাইনে আবেদন করে তা স্থানীয় কাউন্সিলর কার্যালয় বা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। এরপর আবেদনটি জেলা প্রশাসকের পক্ষে কর্মরত স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের কাছে যায়। তার অনুমোদন পাওয়ার পর আবেদনটি আবার স্থানীয় কার্যালয়ে ফেরত আসে। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হলেও ধাপে ধাপে এসব কার্যালয়ে যেতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ইউপি থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় এবং সেখান থেকে আবার ইউপি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

কানিজ ফাতেমার ছেলের স্কুলের আরও কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদেরও বাংলা নাম নিয়ে এমন বিভ্রান্তি হয়েছে। ফারজানা রহমান নামের এক মা জানান, তার সন্তানের সনদে নাম এসেছে ‘ইউওইউও’। তার স্বামী ও মেয়ে—তিনজনের নামই এমন অদ্ভুত এসেছে। তুহিনা আক্তার নামের আরেক মা জানান, তার মেয়ের নাম বাংলায় ঠিক থাকলেও স্বামী–স্ত্রীর নামের জায়গায় শুধু ‘০’ আর ‘–’ দেওয়া। এই অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের বেশির ভাগেরই নামের সংশোধন প্রয়োজন হবে, তাই স্কুল আপাতত আগের ইংরেজি জন্মসনদ নিয়েছে এবং বাংলা জন্মসনদ পরে জমা দিতে বলেছে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, আগের ভুলগুলো কয়েক বছর ধরে সংশোধন করা হচ্ছে। মূলত উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জন্মসনদের আধুনিকীকরণ ও ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রতিরোধে ২০২৩ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়। সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’–এর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে জন্মনিবন্ধনও সম্পৃক্ত। ফলে সরকারের ডিজিটাইজড সুশাসনের সুবিধা তারাই পাবে, যাদের জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হবে। এ জন্য নাগরিকদেরও সচেতন হওয়া দরকার। নিজের বা সন্তানের আবেদন অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে না করিয়ে নিজে করলে ভুল কম হবে।

ঢাকা দক্ষিণের জন্মসনদে পাসপোর্ট না হওয়া এবং ঠিকানা বদলানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। মোহাম্মদ আমির হোসেন নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, তার বোনের জন্মসনদ সংশোধন করতে গিয়ে তিনি আরও জটিলতায় পড়েছেন। ২০০৮ সালে করা জন্মনিবন্ধনটি ইব্রাহিমপুরের ঠিকানায় আগে সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৭-এ ছিল, যা এখন অঞ্চল-৪-এ এসেছে। জন্মনিবন্ধনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অঞ্চল-৪-এ চলে আসা উচিত ছিল। কিন্তু তা না হয়ে জন্মনিবন্ধন দুই অঞ্চলে দুটি দেখাচ্ছে এবং তাতে ভুলও রয়েছে। ভুল সংশোধনের জন্য তাকে সাত দিন ধরে অঞ্চল স্থানান্তরের জন্য ছুটতে হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কেন?’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালে এক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, শুধু বাংলা সনদের ভুলই ১০ কোটির মতো, যার সম্পূর্ণ দায় নিবন্ধন কার্যালয়ের। সে সময় নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নাগরিকদের ক্ষমা চেয়ে বিনা মূল্যে ভুল সংশোধনের আহ্বান জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা তাতে রাজি হননি। তাদের মত ছিল, এটি ব্যক্তির তথ্য, তাই ব্যক্তিরই আবেদন করে সংশোধন করা উচিত।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের জানান, তাঁকেও এমন সংশোধনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যেখানে ভুল তার ছিল না। তিনি বলেন, নিবন্ধন কার্যালয়ের এ ধরনের ভুল ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে অহরহ শোনা যায়। অভিযোগ আছে, এভাবে ‘টাকা খাওয়ার’ ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। কারণ, যত ভুল হবে, ততবার নাগরিকেরা সংশোধন করতে আসবেন, ততবার একটি অসাধু চক্র টাকা আয় করবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, দেশে ৬৭ শতাংশের মতো শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে জন্মের পরপরই শিশুর নিবন্ধনের দায়িত্ব বাধ্যতামূলকভাবে দিলে ভুলের হার ও ভোগান্তি কমে আসতে পারে। এ জন্য জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

তিনি ২০১৫ সালে ছেলের জন্মসনদ নিয়েছিলেন শুধু ইংরেজিতে।

এবারের প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।.এই প্রতিবেদন তৈরিতে যে আটজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের জন্মসনদ ২০২০ সালের আগে করা।

সব খবর