রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্ব, ত্যাগ ও দুঃসাহসিক স্মৃতি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির আয়োজনে এই সভায় বক্তারা বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছয়জন সাংবাদিকের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বিএনপি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তার মতে, রাষ্ট্র গঠন কিংবা ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করার প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি, যার ফলে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ফরিদা আখতার আরও বলেন, করপোরেট মিডিয়া ও সাংবাদিকতাকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ করপোরেট মিডিয়ার একটি বড় অংশ ফ্যাসিবাদী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সংবাদ সেন্সর করেছে। এছাড়া মোবাইল জার্নালিস্টদের ধারণ করা তথ্যপ্রমাণ ভবিষ্যতের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল না হলে দেশে বেশ কিছু টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসত নির্যাতন ও গুমের খড়গ। তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও এর সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে জাতি এখনো অন্ধকারে রয়েছে। মঞ্জু আরও বলেন, সংসদে জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সরকারি সংস্থায় দলীয়করণ এবং বিএনপির ৩১ দফা থেকে সরে আসার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
দৈনিক আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, জুলাই বিপ্লবের সময় শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের হত্যা করেছেন এবং কিছু সিনিয়র সাংবাদিক তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে সহায়তা করেছেন। তবে তরুণ ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন পত্রিকাগুলো এখনো আগের মতো সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন; যারা গত ১৭ বছর রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেছে, তাদেরই আবার পৃষ্ঠপোষকতা করা অত্যন্ত হতাশাজনক।
আলোচনা সভায় ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকন জুলাই গণহত্যায় নিহত ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান। দ্য ডিসেন্ট-এর সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের আগে অন্য কোনো গণআন্দোলনে সাংবাদিকদের শহীদ হওয়ার এমন নজির ছিল না এবং এলিট শ্রেণির সাংবাদিকরা তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজীব আহাম্মদ উল্লেখ করেন, মোবাইল জার্নালিস্টদের অবদানেই আন্দোলনের অধিকাংশ নথি সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে এখনো গণমাধ্যমের অনীহা রয়ে গেছে এবং ২০২৪ সালের শিক্ষা সাংবাদিক সমাজ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি। এছাড়া এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়াজ নিউজের সাইফ আল তুহিন, ঢাকা ডিজিটের আইয়ুব আলী, আরটিভির জনি মজুমদার, আবুল হোসেন হৃদয়, শীর্ষ নিউজের আল-হেলাল মিয়া, সমকালের রবিউল রাজুসহ অনেকে।

















