রাজধানীর মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এবং সাভারের আশুলিয়ায় বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার হয়েছে, তবে মিরপুর ও ফার্মগেটে পাওয়া বস্তুগুলো পরীক্ষা করে বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নাকি জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিকল্পিত অপচেষ্টা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে সারা দেশে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সিটিটিসিসহ পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, গ্রেফতারের পরই নাশকতার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনাকারীদের পরিচয় স্পষ্ট হবে। তিনি আরও বলেন, উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে এবং যে কোনো নাশকতা মোকাবিলায় সিটিটিসি প্রস্তুত। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, দুষ্কৃতিকারীরা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এমন কাজ করছে, তাই আতঙ্কিত না হয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি ওজনের শক্তিশালী পাইপ বোমা উদ্ধার করে ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিট, যা নিষ্ক্রিয় করার সময় এক পথচারী আহত হন। এছাড়া ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর থেকে টাইমারযুক্ত আইইডি উদ্ধার করা হয়। শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া গেলেও পরীক্ষায় সেগুলো পান-সুপারির কৌটা ও পরিত্যক্ত আবর্জনা হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল ও আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হয়েছে। সিটিটিসির এক কর্মকর্তার মতে, বর্তমানে ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জনকারী কিছু ব্যক্তি সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণও নিয়েছিল।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জঙ্গিবাদ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং গোপন নেটওয়ার্ক বা স্লিপার সেল তৈরি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বড় ধরনের হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। র্যাবও সাইবার মনিটরিং ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী।
পুলিশ সদর দপ্তরের জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা পুলিশের বিভিন্ন যানবাহনে হামলা চালাতে পারে। তাই ডিউটিরত বা পার্কিং করা যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। প্রতিটি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে যানবাহন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। থানা, পুলিশ লাইন্স ও অফিস কম্পাউন্ডের মতো স্থানগুলোতে নিয়মিত টহল ও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

















