হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো যখন ক্রমাগত আঞ্চলিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ছে, তখন বিকল্প হিসেবে আর্কটিকের উত্তর সাগরপথ বা ‘নর্দার্ন সি রুট’ নিয়ে বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ছে। চীন ইতোমধ্যেই এই পথে নিয়মিত কনটেইনার পরিবহন শুরু করেছে। যদিও এই পথটি চীন-ইউরোপ বাণিজ্যের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে, তবুও পরিবেশগত ঝুঁকি, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ের কারণে এটি কতটা কার্যকর বিকল্প হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই আর্কটিক জলপথটি মূলত গ্রীষ্মকালীন বরফ সরে যাওয়ার সময় নৌচলাচলের উপযোগী হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকালীন সমুদ্রবরফ দ্রুত কমে যাওয়ায় এই পথে নৌচলাচলের সময়সীমাও দীর্ঘ হচ্ছে। চীনা শিপিং কোম্পানি ‘সি লিজেন্ড’ সম্প্রতি এই রুটে নিয়মিত কনটেইনার সার্ভিস চালু করেছে। ২০২৫ সালের পরীক্ষামূলক যাত্রার পর বর্তমানে তারা চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত সরাসরি পণ্য পরিবহন করছে। কোম্পানিটির দাবি অনুযায়ী, সুয়েজ খাল দিয়ে যেখানে ৪০ দিনের বেশি সময় লাগে, সেখানে এই পথে মাত্র ১৮ দিনেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের মতো তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে এই রুটটি বেশ কার্যকর হতে পারে। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ওপর বেইজিংয়ের নির্ভরতা বাড়ায় সেই পরিকল্পনা আরও বেগবান হয়েছে। বর্তমানে এই রুটের বড় অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
পরিবেশগত দিক থেকে এই রুটটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্কটিকে জাহাজ চলাচলে ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েল ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের কারণ। ২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলে এই জ্বালানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও কিছু জাহাজের এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ভারী জ্বালানি তেল ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ব্ল্যাক কার্বন আর্কটিকের বরফ গলন আরও ত্বরান্বিত করতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গভীর বৈপরীত্য তৈরি করছে। এছাড়া, এসব দুর্গম এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো অত্যন্ত কঠিন। এর পাশাপাশি রাশিয়ার তথাকথিত ‘ছায়া নৌবহর’ বা শ্যাডো ফ্লিটের চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত এসব জাহাজের অনেকগুলোরই সঠিক বীমা বা নিয়ন্ত্রক তদারকি নেই। বেলোনার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ এই পথে চলেছে।
সব মিলিয়ে, নর্দার্ন সি রুট ভবিষ্যতে বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিকে হরমুজ বা সুয়েজ খালের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি। রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত কৌশলগত নির্ভরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে এই ‘বরফ সিল্ক রোড’ এখনো তার নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বেলোনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে যা ওই বছর রুটটিতে চলা কার্গো জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ২০২৬ সালে তুলনামূলক উষ্ণ গ্রীষ্মের কারণে এই ধরনের নৌচলাচল আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি রুশ এলএনজি পরিবহনকারী একটি জাহাজ মে মাসেই নর্দার্ন সি রুটে যাত্রা শুরু করতে সক্ষম হয়। গত সপ্তাহে নজরদারিতে ধরা পড়ে রুশ তেলবাহী জাহাজের একটি অস্বাভাবিক বড় বহরও। প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী এসব জাহাজ উত্তর মেরুর ৫০০ মাইলের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে।

















