জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং নিরন্তর আবিষ্কার পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব বিকাশ ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে জ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। সময়ের ধারাবাহিকতায় নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় মুসলিম জ্ঞান-সাধকরাও পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের মেধা ও মননশীলতা দিয়ে বিশ্ব দরবারে এক উচ্চ আসন অলংকৃত করেছেন। বিশ্বখ্যাত এমনই কয়েকজন জ্ঞান-সাধক ও মুসলিম বিজ্ঞানী তাঁদের অবদানের মাধ্যমে সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
রসায়নের জনক হিসেবে পরিচিত আবু মুসা জাবের ইবনে হাইয়ান ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, আলকেমিবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, দার্শনিক, পদার্থবিজ্ঞানী, ওষুধ বিশারদ ও চিকিৎসক। আনুমানিক ৭২১ সালে ইরানের তুস অঞ্চলে তাঁর জন্ম। তিনি ইস্পাত তৈরি, লোহার মরিচা রোধ, অলংকার খোদাই, কাপড় রং করার প্রণালী, চামড়ার ট্যানিং এবং বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থ সংশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেন। তাঁর লিখিত ‘বুক অব স্টোনস’-এ কৃত্রিম কাকড়া, সাপ এবং রোবট তৈরির পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। কুফায় একটি বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠা করে তিনি মৃত্যু পর্যন্ত সেখানে গবেষণা করেন। প্রায় দুই হাজার বইয়ের মধ্যে রসায়ন বিষয়ক ২৬৭টি রচনা তাঁকে অমর করে রেখেছে। আনুমানিক ৮১৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
বীজগণিতের জনক আবু জাফর মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমি ছিলেন একজন ফার্সি বহুবিদ্যা বিশারদ, যিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলে ব্যাপক প্রভাবশালী অবদান রেখেছেন। আনুমানিক ৭৮০ সালে উজবেকিস্তানের খোরাসান প্রদেশের খাওয়ারিজমিতে তাঁর জন্ম। খলিফা মামুনের গ্রন্থাগার ‘বাইতুল হিকমাহ’-এর প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসেবে তিনি বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘দি কম্পেন্ডিয়াস বুক অব ক্যালকুলেশন বাই কমপ্লেশন অ্যান্ড ব্যালিন্সিং’ আজও অক্সফোর্ডে সংরক্ষিত। তাঁর লেখা ‘আল জাবর ওয়াল মোকাবিলা’ থেকে বীজগণিতের ইংরেজি নাম ‘আল-জেবরা’ শব্দের উৎপত্তি। তিনিই প্রথম পাটিগণিতে শূন্যসহ অন্যান্য সংখ্যার ব্যবহার শুরু করেন, যা ইউরোপীয়দের কাছেও পরিচিতি লাভ করে। আনুমানিক ৮৫০ সালে প্রায় ৭০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ক্রিপ্টোগ্রাফি ও পেরিপ্যাটেটিক দর্শনের জনক আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, গণিতজ্ঞ এবং সঙ্গীতজ্ঞ। আনুমানিক ৮০১ সালে ইরাকের কুফা শহরে তাঁর জন্ম। নবম শতাব্দীতে তিনি গ্রিক দর্শন ও এরিস্টটলের কাজগুলোকে আরবি অনুবাদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে প্রচার করেন। তিনি প্রথম ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতিকে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বে পরিচিত করেন এবং কম্পাঙ্ক বিশ্লেষণ পদ্ধতির মতো নতুন গাণিতিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। গণিত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যবহার করে তিনি ওষুধের কার্যকারিতা পরিমাপক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। দর্শনশাস্ত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে ‘দ্য আরব ফিলোসফার’ বলা হয়। আনুমানিক ৮৭৩ সালে প্রায় ৭২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
আলোকবিজ্ঞানের জনক আবু আলী আল হাসান ইবনে আল হাসান ইবনুল হাইসাম, যা পশ্চিমারা ‘আল হ্যাজেন’ নামে চেনে, তিনি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান পদ্ধতির প্রবক্তা ছিলেন। ৯৬৫ সালে ইরাকের বসরা শহরে তাঁর জন্ম। পদার্থবিজ্ঞানের ওপর তাঁর লেখা সাত খণ্ডের বই ‘আল মানাজির’ বা ‘বুক অব অপটিকস’ আজও বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্য। তাঁর সম্মানে চাঁদের একটি জ্বালামুখের নাম ‘আল হ্যাজেন’ রাখা হয়েছে। দুই শতাধিক বইয়ের মধ্যে ৯৬টি বৈজ্ঞানিক, যার মধ্যে ৪৬টি বর্তমানে টিকে আছে। আনুমানিক ১০৪০ সালে প্রায় ৭৫ বছর বয়সে মিশরের কায়রোতে তাঁর মৃত্যু হয়।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির জনক আবু আলী আল হুসাইন আবদুল্লাহ ইবনে সিনা মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র ও কাব্য-সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন। ৯৮০ সালে উজবেকিস্তানের বোখারার আফশোনা গ্রামে তাঁর জন্ম। মাত্র ১০ বছর বয়সে কোরআন মুখস্থ করেন এবং ১৬ বছর বয়সে চিকিৎসাবিদ্যায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বই ‘আল কানুন ফিত তিব্ব’ চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল হিসেবে পরিচিত। ১০৩৭ সালে প্রায় ৫৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইন্ডোলজির প্রতিষ্ঠাতা, তুলনামূলক ধর্ম ও আধুনিক জিওডেসির জনক এবং প্রথম নৃতত্ত্ববিদ আবু রায়হান আল বেরুনি বা আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-বেরুনি ছিলেন একাধারে বহু ভাষাবিদ, গণিত ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ, রসায়নবিদ এবং ভূগোলবিদ। আনুমানিক ৯৭৩ সালে উজবেকিস্তানের খাওয়ারিজমে তাঁর জন্ম। তিনি স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত বুদ্ধি ও নির্ভীক সমালোচনার জন্য যুগশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর লেখা ১৪৬টি বইয়ের মধ্যে ৯৫টি জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও গাণিতিক ভূগোলের মতো সম্পর্কিত বিষয়ে রচিত। আনুমানিক ১০৫০ সালে ৭৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শিক্ষাবিদ আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তুসি আল-গাজালি আনুমানিক ১০৫৮ সালে ইরানের খোরাসানের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞান-অন্বেষণের জন্য তিনি বেশ কিছু দেশ ভ্রমণ করেন এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতি তাঁর অগাধ তৃষ্ণা ছিল। তিনি ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস ও মূলনীতিসমূহের যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা দেন এবং একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা করেন, যা পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর লেখা ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ বইটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। ১৯ ডিসেম্বর ১১১১ সালে প্রায় ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইরানের বিখ্যাত কবি, গণিতবেত্তা, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ গিয়াসউদ্দিন আবুল ফাতাহ ওমর ইবনে ইবরাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরি ইসলামি বর্ষপঞ্জি সংস্কারেও অবদান রাখেন। ১৮ মে ১০৪৮ সালে ইরানের নিশাপুরে তাঁর জন্ম। তিনি বীজগণিতে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান প্রথম তাঁর হাতেই সম্পন্ন করেন। আততায়ীর হাতে সুলতান মালিক শাহের মৃত্যুর পর তিনি হজ করতে যান এবং পরবর্তীতে নিশাপুরে ফিরে এসে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলো সমাপ্ত করেন। ৪ ডিসেম্বর ১১৩১ সালে ৮৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ, বিচারক ও ধর্মতাত্ত্বিক শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৩০৪ সালে মরক্কোর তানজাহ প্রদেশের তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০ বছর বয়সে তিনি বিশ্বভ্রমণে বের হন এবং একটানা ৩০ বছর ধরে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার সফর করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘রিহলা’ ১৪ শতকের আগে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৩৬৮ বা ১৩৭৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতিশাস্ত্রের জনকদের অন্যতম আবু জায়েদ আবদুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে খালদুন আল-হাদরামি ২৭ মে ১৩৩২ সালে তিউনিসিয়ার তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বিখ্যাত বই ‘কিতাবুল ইবার’ জ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোশ্যাল অ্যান্টলজির প্রতিষ্ঠা করে তাঁকে বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। ১৯ মার্চ ১৪০৬ সালে মিশরের কায়রোতে তাঁর মৃত্যু হয়।

















