বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে আজ এক ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে, যেখানে তারা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার টেস্ট ম্যাচ জিতেছে। ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে এই জয় এসেছে, যা একদিনেরও বেশি সময় হাতে রেখেই নিশ্চিত হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, আর এবার ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলতে এসে এই দ্বিতীয় জয় পেল টাইগাররা।
এই ঐতিহাসিক জয়ের বেশিরভাগ চিত্রই প্রথম তিন দিনে লেখা হয়ে গিয়েছিল। চতুর্থ দিনে এসে বাংলাদেশ সেই বর্ণাঢ্য ইতিহাসের উপসংহার টেনেছে। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন ১০৪ রানের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে দলের ইনিংস হার এড়ালেও, তার এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনা হয়েই রইল। ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে সক্ষম হয়।
চতুর্থ দিনের সকালে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি জাদুতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। উইকেট থেকে পাওয়া টার্ন ও বাউন্স কাজে লাগিয়ে মিরাজ একাই অস্ট্রেলিয়ার লেজ গুটিয়ে দেন। ইনিংসের ৬০তম ওভারে ক্যারিকে কট বিহাইন্ড করার পর ৬৬, ৭৪ ও ৯৬তম ওভারে তিনি বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স এবং শেষ ব্যাটসম্যান নাথান লায়নকেও প্যাভিলিয়নে ফেরান। সব মিলিয়ে ৬৬ রান দিয়ে টেস্টে পঞ্চদশবারের মতো ৫ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখান এই অফ স্পিনার।
লাঞ্চ বিরতিতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানকে নিজের বোলিং কৌশল নিয়ে মিরাজ বলেন, "সহজভাবে সবকিছু করতে চেয়েছি। অফ স্টাম্পের বাইরে (পিচে) প্রচুর ফুটমার্কস আছে, সেখানে বল ফেলার চেষ্টা করেছি। সব ওভারেই উইকেটের খোঁজ করিনি। এমন উইকেটে শৃঙ্খলা রেখে বোলিং গুরুত্বপূর্ণ।" লাঞ্চের পরেও তিনি সেই শৃঙ্খলা ধরে রেখেছিলেন।
তবে সেঞ্চুরি করা গ্রিনের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি তুলে নেন প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার করা পেসার হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে হাসান একাই অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেট দখল করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন।
চতুর্থ দিনের খেলা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ৪২৬ রানের চেয়ে ৬৭ রান পিছিয়ে থেকে, অস্ট্রেলিয়ার হাতে ছিল ৬ উইকেট। কিন্তু লাঞ্চের আগে প্রথম সেশনে ৩১ ওভার ব্যাটিং করে তারা ৩ উইকেট হারায়, যার সবগুলোই নেন মিরাজ। এই ঘূর্ণি তাণ্ডবের মধ্যেও অস্ট্রেলিয়া প্রথম সেশনে ৮২ রান তুলে ইনিংস হার এড়ানো নিশ্চিত করে। লাঞ্চে যায় ৭ উইকেটে ২৪৩ রান নিয়ে, তখন তাদের লিড ছিল ১৫ রান এবং হাতে ছিল ৩ উইকেট। লাঞ্চের পর মাত্র ১১.১ ওভারের মধ্যেই গ্রিনসহ বাকি ব্যাটসম্যানরাও ড্রেসিংরুমে ফিরে যান।
মাত্র ৫৭ রানের জয়ের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশের জয়টা এরপর কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে শূন্য রানে ফেরেন। তবে এরপর আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম অপরাজিত ২৫ রান এবং তিনে নামা অভিজ্ঞ মুমিনুল হক অপরাজিত ৩০ রান করে দলের বিজয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন। মুমিনুল ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে জয়সূচক রানটি সংগ্রহ করেন।
গ্যালারি থেকে তখন একটাই স্লোগান ভেসে আসছিল, "বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!" অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাততালি আর চিৎকারে কিছু সময়ের জন্য ডারউইন যেন সত্যিকারের বাংলাদেশে পরিণত হয়েছিল। ড্রেসিংরুমের সামনে ক্রিকেটাররা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভাসছিলেন, আর অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার শিবির তখন পুরোপুরি স্তব্ধ।
চতুর্থ দিনে টেস্টের সম্ভাব্য পরিণতি বুঝতে পেরে ছুটির দিনেও খুব সামান্য কিছু অস্ট্রেলিয়ান দর্শক মাঠে এসেছিলেন। গ্যালারি ছিল প্রায় ফাঁকা, মাঠের বাইরে ছিল না গত তিন দিনের উৎসবমুখর পরিবেশ। এমনকি ভিআইপি লাউঞ্জ হিসেবে পরিচিত স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জও প্রতিটি চেয়ার শূন্য পড়ে ছিল।
লাউঞ্জের এক কর্মী জানান, ডারউইন টেস্ট তৃতীয় দিনের পর আর চলবে না এমনটা ধরে নিয়ে চতুর্থ দিনের জন্য কেউ প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জের টিকিট কাটেনি। শেষ পর্যন্ত টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার শোচনীয় অবস্থার কারণে নতুন করে আর টিকিট বিক্রি হয়নি। তাই স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ আগের দিনই জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ বন্ধ থাকবে। এর থেকেই বোঝা যায়, মাঠের খেলা অস্ট্রেলিয়া দল চার দিনে টেনে নিতে পারলেও ডারউইনের মানুষ তৃতীয় দিন শেষেই হার মেনে নিয়েছিল।
এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল। ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন হাসান মাহমুদ।
প্রথমবার যখন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড পেরিয়ে ইনিংস হার এড়াল।

















